ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের তিন বছর পূর্ণ হতে চলল গাজা উপত্যকায়। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে শহরটির চেনা অবয়ব আমূল বদলে গেছে। ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, এ সময়কালে গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন হয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নতুবা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। একসময়ের জনবহুল রাস্তা, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং মানুষের পদচারণায় মুখর এলাকাগুলো এখন কেবলই কংক্রিটের স্তূপ। উপকূলের জনপ্রিয় স্থানগুলোতে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষের ছোট ছোট তাঁবুর সারি।
সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের দিক থেকেও গাজা অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর যাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় অন্তত ১৬৪টি সাংস্কৃতিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিক বা শৈল্পিক গুরুত্বসম্পন্ন ১২৮টি ভবন, ১৪টি ধর্মীয় স্থাপনা, ৯টি স্মৃতিস্তম্ভ, ৮টি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান, ২টি জাদুঘর এবং ৩টি সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ভান্ডার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এই ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হওয়া উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে গাজার প্রাচীনতম গ্রেট ওমারি মসজিদ, ত্রয়োদশ শতকের মামলুক আমলের কাসর আল-বাশা প্রাসাদ, প্রাচীন সামারিটান গোসলখানা, ঐতিহাসিক আল-কিসারিয়া বাজার এবং সেন্ট পোরফিরিয়াস গির্জা কমপ্লেক্স। এর মধ্যে কাসর আল-বাশা প্রাসাদটি ২০১০ সালে সংস্কার শেষে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে রূপ দেওয়া হয়েছিল, যা এখন যুদ্ধের আঘাতে বিপর্যস্ত। এছাড়া বন্দরের পাশে থাকা আল-হাসাইনা মসজিদটি ২০২৩ সালের নভেম্বরে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।
শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে। গাজা সিটির রেমাল এলাকায় অবস্থিত এই ক্যাম্পাসের অধিকাংশ ভবন ভেঙে পড়েছে, আর টিকে থাকা অংশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। একই দশা হয়েছে রেমাল এলাকায় অবস্থিত রাশাদ আল-শাওয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের, যা একসময় প্রদর্শনী ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বন্দরের বিভিন্ন অংশে তাঁবু টাঙিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাস্তুচ্যুত হাজারো পরিবার।
গাজার প্রধান উপকূলীয় সড়ক আল-রশিদ স্ট্রিটের সৌন্দর্য এখন শুধুই স্মৃতি। ভূমধ্যসাগর ঘেঁষে ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি একসময় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও হোটেলে জমজমাট থাকত। যুদ্ধের ফলে এই সড়কের বিশাল অংশ এখন ব্যবহারের অযোগ্য। একই অবস্থা গাজার প্রধান বন্দরের, যা আগে জেলেদের জীবিকার উৎস ছিল; এখন সেখানে তাঁবুর শহর গড়ে উঠেছে এবং বহু মাছ ধরার নৌকা নষ্ট হয়ে গেছে। একসময় যে সড়কগুলো ছিল মানুষের চলাচল, কেনাকাটা ও আড্ডার জায়গা, সেখানে এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের সারি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গাজার সড়ক, বাজার, স্কুল, হাসপাতাল ও জনসমাগমের জায়গাগুলো ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সেখানে মানুষ কাজ করতেন, পড়াশোনা করতেন, কেনাকাটা করতেন এবং পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও বড় ধাক্কা খেয়েছে গাজা। ১৯৫২ সালে চালু হওয়া ইয়ারমুক স্টেডিয়াম, যা ফিলিস্তিনের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম ফুটবল ভেন্যু ছিল, এখন আর খেলার উপযোগী নেই। স্টেডিয়ামের মাঠ ও গ্যালারি এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এদিকে, পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান পুকুর। ২০০০ সালে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য তৈরি পাঁচ লাখ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার এই পুকুরটিতে নিষ্কাশনব্যবস্থা অচল হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে পয়োনিষ্কাশনের পানি মিশে যাচ্ছে। এতে পুরো এলাকার পর এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এসব স্থাপনার কোনোটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কোনোটি আবার ব্যাপক ক্ষতি নিয়ে এখনো দাঁড়িয়ে আছে।
আল-জাজিরার একটি আলোকচিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে দীর্ঘদিনের বোমাবর্ষণ গাজার সড়ক, বাজার ও জনজীবনের জায়গাগুলোকে আমূল বদলে দিয়েছে। যুদ্ধের আগে ও পরের স্থিরচিত্রগুলো দেখলে স্পষ্ট হয়, গাজার ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো আজ কীভাবে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শন ও সাধারণ মানুষের স্বপ্ন—সবই যুদ্ধের আগুনে আজ বিলীন হওয়ার পথে।






