মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় গ্রাফটিং পদ্ধতিতে টমেটো চাষে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও উদ্যোক্তারা। বর্তমানে এটি জেলার অন্যান্য অঞ্চলেও বিস্তৃত হয়েছে। খরিপ-১, রবি ও গ্রীষ্ম—তিন মৌসুমেই এখানে টমেটো চাষ হচ্ছে, যার মধ্যে খরিপ-১ মৌসুমে আগাম জাতের টমেটো চাষে লাভের ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে উৎপাদনের এই সাফল্য ম্লান হয়ে গেছে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায়। সার ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমানে এ পদ্ধতি জেলার অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে উৎপাদনের পুরো ঝুঁকি তাদেরই বহন করতে হচ্ছে। পাশাপাশি টমেটো গাছে রোগ দেখা দেওয়ায় অনেক ক্ষেতের গাছ তুলে নতুন করে রোপণ করতে হয়েছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ১,২০০ হেক্টর জমিতে রবি মৌসুমে, ১৩০ হেক্টর জমিতে খরিপ-১ মৌসুমে এবং ১৯ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটো আবাদ হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ৬৫ লাখের বেশি গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদিত হয়েছে, যার প্রতিটি ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কমলগঞ্জ উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন, বিশেষ করে আদমপুর, মাধবপুর ও ইসলামপুর এলাকা এখন টমেটো চাষের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা মিলছে না। কৃষকদের ভাষ্য, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মাঠে এসে টমেটো ক্ষেত বা গ্রাফটিং চারার খোঁজ-খবর নেন না, প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেন না।
কৃষকদের অভিযোগ, জেলার বাইরে টমেটো সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার বা প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমে অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় তারা কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। তরুণ উদ্যোক্তা আব্দুল মান্নান জানান, তিনি ১৩ বিঘা জমিতে টমেটো চাষে প্রায় ২৬ লাখ টাকা খরচ করেছেন। তার দাবি, কমলগঞ্জে গ্রাফটিং টমেটো ঘিরে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। তবুও সরকারি সহায়তা ও স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা না থাকায় কৃষকদের সংকট বাড়ছে। অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
বাজারে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত টমেটো ও কাঁচামরিচের প্রভাব পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে দাম কমেছে বলে দাবি কৃষকদের। গত বছর যেখানে আগাম টমেটো ১০০ থেকে ১১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল, এবার তা ৫০ থেকে ৬০ টাকায় নেমে এসেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ধলাই ও গোপলা নদীর ভাঙনে অনেকের ক্ষেত ও চারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোগবালাই দমনে উচ্চমূল্যের কীটনাশক ব্যবহার করেও অনেক ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, ভারত থেকে টমেটো ও কাঁচামরিচ আমদানিতে শুল্ক শিথিল করায় দেশি উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
তবে টমেটো চাষকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। পাশের চা-বাগানগুলোর শ্রমিকরা বাগানের কাজের বাইরে টমেটো ক্ষেত ও চারা তৈরির কাজে যুক্ত হয়ে বাড়তি আয় করছেন। টমেটো ক্ষেতে নারীরা দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং পুরুষ শ্রমিকরা ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন, যা তাদের সংসার পরিচালনায় সহায়তা করছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানান, তিত বেগুনের গাছের সঙ্গে গ্রাফটিং করে চারা উৎপাদন করলে গাছ মজবুত থাকে এবং ফলন বাড়ে। তিনি জানান, কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা দেওয়ার তালিকা তৈরির কাজ চলছে। এছাড়া কমলগঞ্জ উপজেলা কর্মকর্তা সন্দ্বীপ কুমার তালুকদার জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত ৩৮০ জন কৃষকের নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছে এবং নদীর বাঁধ মেরামতের উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন জানান, হিমাগার স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। নিম্নমানের কীটনাশক বা ওষুধের বিষয়ে অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, পাতামরা ও কুঁকড়ে যাওয়া রোগ দমনে আক্রান্ত গাছ অপসারণ এবং সঠিক ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ নিয়মিত দেওয়া হচ্ছে।





