পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা এবং তাদের জাতীয়তা নিয়ে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ কিয়াউ সোয়ে মোয়ে’র সঙ্গে আয়োজিত এক বৈঠকে সরকারের এই কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার অনুবিভাগের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জারি করা সাম্প্রতিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির অনেক উপাত্তই ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি বলে জানিয়েছে ঢাকা। বিষয়টি দ্রুত সংশোধনের তাগাদা দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ব্যবস্থার অধীন নিবন্ধিত তথ্যই শরণার্থীদের সঠিক সংখ্যা ও পরিচয় প্রতিফলিত করে। এর আগে গত শনিবার (১৫ আগস্ট) মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছিল যে, বাংলাদেশ থেকে দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ শরণার্থীর একটি তালিকা তারা জুলাই মাসের শেষ নাগাদ যাচাই-বাছাই করেছে।
মিয়ানমারের ওই বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, যাচাই করা ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ ব্যক্তির মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইন বাসিন্দা ছিলেন। একই সঙ্গে তারা ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ ব্যক্তির পরিচয় সফলভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানায় এবং ৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে অভিযোগ তোলে। এছাড়া দেশটি রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঐতিহাসিক সত্যতাকেও অস্বীকার করেছে, যা নিয়ে বাংলাদেশ তীব্র আপত্তি জানিয়েছে।
মঙ্গলবারের বৈঠকে মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান দুই দেশের সম্মত দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর ভিত্তিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য রাষ্ট্রদূতকে তাগিদ দেন। আলোচনায় শরণার্থীশিবিরে জন্মগ্রহণকারী শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া নতুন আগমনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। বাংলাদেশ বর্তমানে তাদের নিবন্ধনের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এবং ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের প্রাথমিক তালিকার পরের রোহিঙ্গাদের তথ্যও যথাসময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিনিময় করা হবে বলে জানানো হয়।
তৌফিক-উর-রহমান যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় এই অতিরিক্ত তথ্যগুলো সঠিকভাবে প্রতিফলিত করার অনুরোধ জানান। পাশাপাশি তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নন। কারণ, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সম্প্রতি পর্যন্ত স্বীকৃত তাদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে। এ সময় রাষ্ট্রদূত উ কিয়াউ সোয়ে মোয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণগুলো তার দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং যাচাই করা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে তাঁর সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান আবারও জোর দিয়ে বলেন, “এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান নিহিত রয়েছে রোহিঙ্গাদের নিজ ভিটেমাটি রাখাইনে নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের মধ্যে।” এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, “মিয়ানমারের দিক থেকে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, সেখানে সংখ্যার কিছু বিভ্রান্তি আছে। যেটার সাথে বাংলাদেশের সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একমত না। তো, উনাদের সাথে কথা হয়েছে…মিয়ানমার অ্যাম্বাসেডর আমাদেরকে আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকারের সাথে উনি কথা বলবেন।”
মিয়ানমার সরকারের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া ধীরগতির কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, “যেন আরও একটু দ্রুতগতিতে তারা ভেরিফিকেশন প্রসেসটা করে।” বাংলাদেশ যে মানবিক দিক বিবেচনায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছিল, সে কথাও রাষ্ট্রদূতকে মনে করিয়ে দেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই যে তারা সুস্থভাবে, স্বাভাবিকভাবে একটা সেইফ অবস্থায় ফিরে যাক তাদের দেশে। তাদের একটা নিজেদের আইডেন্টিটি আছে, সেই আইডেন্টিটি নিয়েই তারা ফেরত যাবে।”
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে নৃশংস সামরিক অভিযানের কারণে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা, যা বাংলাদেশের হিসাবে আট লাখের বেশি, সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এছাড়া কক্সবাজারে আগে থেকেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়ে আছে। এসব সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও জাতিগত মিলিশিয়াদের নৃশংস সহিংসতা থেকে রক্ষা পেতে দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে বসবাস করছে।






