ইন্দোনেশিয়ার ফ্লোরেস দ্বীপে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৪৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। শনিবার স্থানীয় সময় ভোর ৫টার দিকে আঘাত হানা ৭.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পের পর থেকে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান জোরদার করা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া ও ভূ-পদার্থবিজ্ঞান সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১৫ কিলোমিটার গভীরে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ওই প্রদেশ, যেখানে ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পূর্ব মাংগারাইয়ে ১৭ জন, সিক্কায় তিনজন এবং এনগাদা, এন্ডে ও পশ্চিম মাংগারাই প্রদেশে অন্তত একজন করে নিহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অন্তত দুজন গুরুতর এবং ১১ জন সামান্য আঘাত পেয়েছেন। রুটেং শহরের একটি হাসপাতালের বাইরে আহতদের চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী চিকিৎসা তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে।
ভূমিকম্প ও পরবর্তী কয়েক ডজন আফটারশকের কারণে শত শত ভবন মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৫০টিরও বেশি বাড়ি, বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপাসনালয় এবং সরকারি অফিস রয়েছে। ফ্লোরেসের মাউমের বন্দরে ধারণ করা ভিডিওতে দেখা গেছে, টার্মিনাল ভবনের কংক্রিটের অংশ ভেঙে ফেরিযাত্রীদের ওপর পড়ছে এবং জাহাজের গ্যাংওয়ে ভেঙে কয়েকজন যাত্রী সাগরে ছিটকে পড়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং ১০ হাজার ৫০০টি ত্রাণ প্যাকেজ অপারেশন কেন্দ্রে পৌঁছেছে। তবে অঞ্চলটি দুর্গম ও পাহাড়ি হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে সময় লাগছে। ভূমিধসের কারণে অনেক গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের গভর্নর এমানুয়েল মেলকিয়াদেস লাকা লেনা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ধসে পড়া ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়ে ঘুমের মধ্যেই অনেকের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আর্নল্ড ওয়েলিয়ান্তো জানান, তীব্র ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে তিনি আতঙ্কিত হয়ে সন্তানের ঘরে ছুটে যান।
ভূমিকম্পের পরপরই সুনামি সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। সমুদ্রের পানি সরে যেতে দেখে প্রায় ২ হাজার মানুষ পাহাড়ের দিকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যান। তবে তিন ঘণ্টা পর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন না পাওয়ায় সতর্কতা প্রত্যাহার করা হয়।
এদিকে, ইন্দোনেশিয়ার অন্য প্রান্তে ৬.৯ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনাগুলো আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে কেন এই অঞ্চলকে ‘রিং অব ফায়ার’ বা ‘অগ্নিবলয়’ বলা হয়। মূলত তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ইন্দোনেশিয়া সবসময়ই ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত।
জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা বিমা রিজেন্সি ও সিটি পর্যন্ত ভূ-কম্পন অনুভূত হওয়ার কথা জানিয়েছে। কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার এবং উপকূলীয় এলাকা ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ায় শনিবারের শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ৪৭ জন নিহত হওয়ার পর জীবিতদের সন্ধানে উদ্ধারকর্মীরা এখন তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে এ দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও পরিষ্কার নয় কর্তৃপক্ষের কাছে।
এই অঞ্চলটি দুর্গম ও পাহাড়ি হওয়ায় ধ্বংসযজ্ঞের পূর্ণ মাত্রা নিরূপণ করতে সময় লাগবে।
একটি জাহাজের সঙ্গে যুক্ত গ্যাংওয়ে ভেঙে পড়লে কয়েকজন যাত্রী সাগরেও ছিটকে পড়েন।
তালিবুরা গ্রামের বাসিন্দা আর্নল্ড ওয়েলিয়ান্তোর মতো অন্যরা অবশ্য ঘুম থেকে ঝাঁকুনি খেয়ে জেগে ওঠেন।
তিনি বলেছেন, “আমি ভয় পেয়ে ঘুম থেকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে আমার সন্তানের ঘরে চলে যাই”।
এর ফলে প্রায় ২ হাজার মানুষ নিজেরাই নিরাপদ স্থানে সরে যান।
অভিজ্ঞ উদ্ধারকারী দলগুলো দিনভর অক্লান্ত পরিশ্রম করে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের চেষ্টা করেছে।





