পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ভীমরুলি, আটঘর ও কুড়িয়ানা এলাকার ভাসমান পেয়ারা বাজার নিয়ে প্রতি বর্ষা মৌসুমে গণমাধ্যমে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব খবরে সাধারণত পেয়ারার ফলন, দামের অস্থিরতা, কৃষকের লোকসান কিংবা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে খালে পেয়ারা ফেলে দেওয়ার মতো হতাশাজনক চিত্রই উঠে আসত। তবে সম্প্রতি সংবাদ সংস্থা ইউএনবিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই বাজারের এক নতুন রূপ সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ভিডিওর কল্যাণে এই ভাসমান বাজার এখন জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা পেয়ারার চাহিদা ও দাম বাড়িয়ে স্থানীয় অর্থনীতিকে করেছে শক্তিশালী।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাধারণ ব্যবহারকারীদের তৈরি করা সত্যনিষ্ঠ ও প্রকৃত ভিডিও যে কতটা শক্তিশালী হতে পারে, তা এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট। একই মাধ্যম ব্যবহার করে যেমন ঘৃণা বা বিতর্ক ছড়ানো সম্ভব, তেমনি ইতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে একটি জনপদের ভাগ্যও বদলে দেওয়া যায়। ভীমরুলি, আটঘর ও কুড়িয়ানার প্রায় দুই শতাব্দীর পুরোনো এই ভাসমান বাজারের অর্থনীতি এখন পর্যটকদের আনাগোনায় নতুন গতি পেয়েছে। একটি ছবি বা ভিডিও কেবল প্ল্যাটফর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের ভ্রমণ গন্তব্য নির্ধারণের নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।
সাধারণ মানুষের তৈরি কনটেন্টের কারণে সারা দেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়া বাংলাদেশের এমন আরও অনেক স্থান রয়েছে। বরিশালের উজিরপুর উপজেলার সাতলা গ্রামের শাপলা বিল কিংবা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁও গ্রামের জাদুকাটা নদীর তীরের শিমুল বাগান—এসব জায়গা একসময় কেবল স্থানীয়দের কাছেই পরিচিত ছিল। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভ্রমণপিপাসুদের অভিজ্ঞতা ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর এগুলো দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছে। কোথাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আবার কোথাও রজনীগন্ধা, গোলাপ, গাঁদা, গ্ল্যাডিওলাস, সরিষা বা সূর্যমুখী ফুলের বিস্তৃত খেত পর্যটকদের চুম্বকের মতো আকর্ষণ করছে।
এখন মানুষ মৌসুমভেদে ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। যে মৌসুমে যে জায়গাটি সবচেয়ে বেশি সুন্দর হয়ে ওঠে, পর্যটকরা সেখানেই ছুটে যান। গৎবাঁধা ভ্রমণ গন্তব্যের বদলে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সৌন্দর্য উপভোগ করতে মানুষ এখন আগ্রহী। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ডেনিস ম্যাককুয়েল তার ‘ম্যাস কমিউনিকেশন থিওরি: অ্যান ইন্ট্রোডাকশন’ গ্রন্থে মিডিয়াকে একটি জানালার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি ঘটনা ও অভিজ্ঞতার এমন একটি জানালা যা আমাদের দৃষ্টিসীমাকে বিস্তৃত করে এবং অন্যের হস্তক্ষেপ ছাড়াই আমাদের চারপাশে কী ঘটছে, তা নিজের চোখে দেখার সুযোগ দেয়।
দীর্ঘ সময় ধরে এই জানালার নিয়ন্ত্রণ ছিল কেবল মূলধারার গণমাধ্যমের হাতে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্থানের ফলে এই ক্ষমতা এখন সাধারণ মানুষের হাতে চলে এসেছে। মিডিয়া গবেষক হেনরি জেনকিন্স তার ‘কনভার্জেন্স কালচার: হোয়্যার ওল্ড অ্যান্ড নিউ মিডিয়া কোলাইড’ গ্রন্থে একে ‘অংশগ্রহণমূলক সংস্কৃতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে মুহূর্তেই ছবি বা ভিডিওর দৃশ্যপট বদলে ফেলা সম্ভব। কৃত্রিমভাবে তৈরি এসব দৃশ্য হয়তো ক্ষণিকের আনন্দ দেয়, কিন্তু বাস্তবতা-নির্ভর চিত্র বা ভিডিও মানুষকে নতুন বার্তা দেয় এবং ভ্রমণে আগ্রহী করে তোলে, যার সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি।
পরিশেষে এটি স্পষ্ট যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অত্যন্ত শক্তিশালী একটি মাধ্যম। এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে আমরা দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করব, নাকি বিদ্বেষ ছড়াবো—সেই সিদ্ধান্ত আমাদের ওপরই নির্ভর করছে। সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের মাধ্যমেই গ্রামীণ অর্থনীতিসহ সামগ্রিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।


