মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক অস্থিরতা সম্প্রতি এক মারাত্মক রূপ নিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের মধ্যেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইয়েমেন সীমান্ত। ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের মুখোমুখি অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে সৌদি আরব। একদিকে যেমন ইয়েমেনে সৌদি বিমান হামলা চলছে, অন্যদিকে তেমনি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে হুথিরা। বিশেষ করে লোহিত সাগরের উপকূলে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বাব এল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এই যুদ্ধের তীব্রতা আরও বাড়ছে। চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে সরাসরি আঘাত হানতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
বাংলাদেশি জনশক্তির জন্য সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান জোগানদাতা হলো সৌদি আরব। এর বাইরেও বাংলাদেশ নিজের জ্বালানি তেলের চাহিদার বড় অংশই মেটায় এই দেশটি থেকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের বিনিয়োগ আকর্ষণের বড় ধরনের তোড়জোড় চললেও এই সংঘাতের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও জ্বালানি নিরাপত্তা গভীর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবের পাশাপাশি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশও।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সৌদি আরবে কর্মরত আছেন ৪০ লাখেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি। দেশের মোট বৈদেশিক কর্মসংস্থানের একটি বিশাল অংশই এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শুধু ২০২৫ সালেই বাংলাদেশ থেকে রেকর্ড ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন কর্মী সৌদিতে পাড়ি জমিয়েছেন, যা ছিল ওই বছর বিদেশে যাওয়া মোট জনশক্তির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। এছাড়া চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই আরও ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭৭ জন বাংলাদেশি সৌদি আরবে কাজের উদ্দেশ্যে গিয়েছেন। ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে সামান্য ব্যত্যয় ঘটলেও তা বাংলাদেশের কর্মসংস্থানে বড় আঘাত হানবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুসারে, দেশের মোট রেমিট্যান্স আয়ের বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ থেকে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার, যা পরবর্তী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এমনকি চলতি নতুন অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়েও প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশটি থেকে ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ ডলার সমমূল্যের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই অবস্থায় সংঘাতের জেরে সৌদির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাহত হলে নির্মাণ বা সেবা খাতের মতো শ্রমঘন প্রজেক্টগুলো থমকে যেতে পারে, যার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ধস নামার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এই চলমান পরিস্থিতি ও সংকটের বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন জানান, যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়, তবে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে। অতীতে করোনা মহামারির সময় যেমন আমরা দেখেছিলাম যে অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে সেবা ও শিল্প খাতে কাজের চাহিদা কমে গিয়েছিল এবং অনেক প্রবাসীকে কাজ হারিয়ে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হয়েছিল, এবারের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ঠিক তেমনই নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে চাকরিচ্যুত কর্মীদের ফেরত আসার আশঙ্কার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের দেশীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে।
সম্প্রতি সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটি ও আরামকোর তেল স্থাপনাসহ দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত, আবহা, নাজরান ও জিজান শহরে বড় ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। এর প্রেক্ষিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর দেশটির সিভিল ডিফেন্স এই চার শহরে বিশেষ জরুরি সতর্কতা জারি করে। পরিস্থিতি আরও অবনতিশীল হওয়ায় পরের দিন মক্কা, জেদ্দা, তায়েফ, আলউলা এবং প্রধান তেল রফতানিকারক বন্দর ইয়ানবুতেও নাগরিকদের নিরাপদে ঘরের ভেতর থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। মক্কা সীমান্তের কাছাকাছি হুথিদের একটি ড্রোন ধ্বংস করার ঘটনাকে সৌদি কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও বিপদের ‘রেড লাইন’ হিসেবে অভিহিত করলেও হুথিরা মক্কাকে লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করেছে। সম্প্রতি তায়েফ প্রদেশে একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক ইয়েমেনি নাগরিক নিহত হওয়ার খবরও মিলেছে।
পবিত্র নগরী মক্কায় অবস্থানকারী প্রবাসী বাংলাদেশি সাব্বির রহমান জানান, মসজিদুল হারামে জরুরি সতর্কতার সাইরেন বাজার পর স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রবাসীদের মধ্যেও ব্যাপক ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। পবিত্র মক্কায় কোনো হামলা হবে না এমন ধারণা থাকলেও সাম্প্রতিক নিরাপত্তা হুমকির পর মানুষ প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে জেদ্দায় ব্যবসা করা ফেনীর বাসিন্দা নুরুল আফসার বলেন, বৈশ্বিক মহামারি করোনার ধাক্কা কাটিয়ে সৌদি আরবের স্থানীয় বাজার যখন একটু স্থিতিশীল হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই এই যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রবাসীদের নতুন শঙ্কায় ফেলেছে। ক্রেতাদের সমাগম হ্রাস পাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে বাংলাদেশ মূলত জ্বালানি তেলের জন্য আমদানির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল, যার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। এই চাহিদার বড় অংশ পূরণে প্রতি বছর প্রায় ১৪-১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়, যার অন্যতম জোগানদাতা সৌদি আরামকোর উৎপাদিত ‘অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড’। হুথিদের ড্রোন হামলায় সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ‘ইস্ট-ওয়েস্ট’ তেল পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ইতোমধ্যে ইউরোপে দেশটির জ্বালানি রফতানি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে এবং সেপ্টেম্বরের বেশ কয়েকটি কার্গোও বাতিল করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশে এখনও তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, তবুও হরমুজ বা বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে নৌ চলাচলে হুথিদের হুমকির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ও পণ্য পরিবহন খরচ একলাফে অনেক বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
সৌদি আরব নিজেও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বৈশ্বিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সহিংসতার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন আগের দৈনিক ১ কোটি ৯ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মাত্র ৬২ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা বিগত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। জ্বালানি রফতানি ও কর কমে আসায় দেশটির ২০২৬ সালের বাজেটে প্রায় ১৬৫ বিলিয়ন রিয়াল বা ৪৪ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই বিপুল ঘাটতির কারণে সৌদি প্রশাসন যদি তাদের উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ কমিয়ে দেয়, তাহলে নতুন কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যাবে এবং বর্তমানে কর্মরত বাংলাদেশিদের আয় কমে যাবে।
বাংলাদেশি পণ্যের প্রধান একটি বাজার ও বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রও সৌদির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। সৌদি সরকারি ডেটাবেজ ‘ডেটাসৌদি’র দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৪০ কোটি ডলার। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে প্রায় ৪৫ দশমিক ৮ কোটি ডলার সমমূল্যের পণ্য রফতানি হয়েছে, যার প্রধান খাত ছিল তৈরি পোশাক। পাশাপাশি গত জুলাই মাসে সৌদি আরবের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে বে টার্মিনাল ও পোর্ট নির্মাণে ১৮ কোটি ডলারসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। এছাড়া আগামীতে বাংলাদেশে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্য সামনে রেখে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে রিয়াদ সফরের আমন্ত্রণ জানালেও এই যুদ্ধের কারণে বড় বিনিয়োগগুলো আটকে যাওয়ার প্রচ্ছন্ন শঙ্কা রয়ে গেছে।
এই সামগ্রিক সংকটের গভীরতা ও প্রভাব ব্যাখ্যা করে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে। তাই এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের প্রধান উৎসটি বড় ধাক্কা খাবে। শুধু তাই নয়, লোহিত সাগরের নৌপথ অনিরাপদ হয়ে পড়লে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের বিঘ্ন ও দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য হবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ অপরিশোধিত তেল দেশের রিফাইনারিতে পরিশোধনের মাধ্যমে ডিজেল, বিটুমিন ও পেট্রলসহ ১৩ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়। চাকরির আরও তথ্য: রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল বে টার্মিনাল নির্মাণে ১৮ কোটি ডলার বিনিয়োগের পাশাপাশি বাংলাদেশের বন্দর খাতে মোট বিনিয়োগ ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। চাকরির আরও তথ্য: সৌদি আরব থেকে বড় অংকের বিনিয়োগ আনার চেষ্টাও চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রেমিট্যান্স যেভাবে আসছিল, সেটি ব্যাহত হলে রিজার্ভ বাড়ার গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরদিন মক্কা, জেদ্দা ও তায়েফেও বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে নিরাপদ থাকতে বলা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যদিও এখন পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবন অনেকটা স্বাভাবিক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমরা সবাই মনে করতাম, সংঘাত যতই হোক, মক্কা নগরীতে হামলার মতো কোনো ঘটনা ঘটবে না।






