বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে মাছ ধরার নৌকা নিয়ে যাওয়া জেলে, মৌয়াল ও বাউয়ালিদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মুখোমুখি হওয়া থেকে রক্ষা করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। হালকা ও টেকসই এই নাইলনের বেড়া বননির্ভর মানুষের যাতায়াত রয়েছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা হচ্ছে, যা পরিবেশ বা বাস্তুতন্ত্রের কোনো ক্ষতি না করেই মানুষ ও বাঘের মাঝে একটি কার্যকর দূরত্ব বজায় রাখছে। মাছ, কাঁকড়া, মধু ও কাঠ সংগ্রহের জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত বনের ওপর নির্ভর করেন। সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার বা মানুষের ওপর আক্রমণের পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকে মুখোমুখি সংঘর্ষ ঠেকানো অনেক বেশি কার্যকর। বনের সীমানার কাছাকাছি মানুষের ঘুমানো, রান্না করা বা খাবার জমা রাখার কারণে এলাকাগুলো বাঘের আক্রমণের দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংরক্ষণবিদদের মতে, এখান থেকে মূল শিক্ষণীয় বিষয় হলো- মানুষ রক্ষা আর বাঘ বাঁচানো দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়।
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান জানান, একটি তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পের আওতায় বন বিভাগ ইতোমধ্যে বনের চারপাশে ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় এই নাইলন ফেন্স বা বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ করেছে। ধানসাগর, কৈখালী ও কৈলাশগঞ্জের মতো সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ জনপদ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে অত্যন্ত শক্ত নাইলন জালের এই বেড়া সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে।
কংক্রিটের স্থায়ী দেয়াল বা ধাতব কাঠামোর মতো না হয়ে এই নাইলনের বেড়া অত্যন্ত দ্রুত স্থাপন ও প্রয়োজনে সরিয়ে নেওয়া যায়। জোয়ার-ভাটা, কাদা এবং ঋতু পরিবর্তনের মতো সুন্দরবনের প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশে এটি ব্যবহার করা খুবই উপযোগী। বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই বেড়া নির্মাণের পর থেকে মানুষ ও বাঘের মধ্যে কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৮ সালে সর্বশেষ লোকালয়ে বাঘ ঢুকে পড়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল। কাজের প্রয়োজনে তাদের প্রায়ই বাঘের বিচরণক্ষেত্রে প্রবেশ করতে হয়। এটি তুলনামূলকভাবে খুব দ্রুত বসানো যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খুলে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়াও সম্ভব। বিশেষ করে অস্থায়ী ক্যাম্প বা যেখানে বাউয়ালিরা দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, সেসব জায়গায় এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর।
বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানিয়েছেন, বন্যপ্রাণীর জন্য এই নাইলনের বেড়া একটি মনস্তাত্ত্বিক বাধা হিসেবে কাজ করে। বেড়া দেখতে পেলে বাঘ বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী সাধারণত বনের ভেতরে ফিরে যায়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত চার-পাঁচ বছরে সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে এসেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরেই মানুষ ও বাঘের সংঘাত একটি বড় সমস্যা। বাঘ সচরাচর যে পথ দিয়ে চলাচল করে, সেখানে বেড়া দিয়ে মানুষকে আলাদা করতে পারলে তা সুরক্ষার বাড়তি স্তর হিসেবে কাজ করে।
সুন্দরবন হলো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল ও বিচরণ ক্ষেত্র। বনের শীর্ষ শিকারি হিসেবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে এই বন লাখো মানুষের জীবিকার উৎস হওয়ায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা প্রায় অসম্ভব। তাই নাইলনের বেড়ার পাশাপাশি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত টহল এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার মতো নানা পদক্ষেপের সমন্বয়ে একটি বিস্তৃত কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে পরিবেশবিদ ও সংরক্ষণবাদীরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, বেড়াগুলো এমনভাবে তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে যেন কোনো বন্যপ্রাণী এতে আটকে না যায়, আঘাতপ্রাপ্ত না হয় বা তাদের স্বাভাবিক চলাচলের পথ ব্যাহত না হয়। বাঘ সত্যিই এই বেড়া এড়িয়ে লোকালয়ে আসা কমাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করার ওপরও জোর দিয়েছেন তারা।
বন বিভাগের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে মোট ১২৫টি রয়েল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে। অন্যদিকে ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান বলছে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে গত প্রায় ২০ বছরে মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্বে আনুমানিক ৩০০ জন মানুষ এবং ৩৮টি বাঘের প্রাণহানি ঘটেছে। একই সময়ে মানুষের ওপর আক্রমণ ও সংঘাতের ১৭২ থেকে ৩২৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষা এবং বাঘের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উভয়ের সহাবস্থান বজায় রাখতে এই নাইলনের বেড়া একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেহেতু স্থানীয় জনগোষ্ঠী জীবিকার জন্য সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল, তাই নাইলনের বেড়ার মতো কম খরচের প্রযুক্তি বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে বাস্তবসম্মত পথ দেখাতে পারে। উল্লেখ্য, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ২০ বছরের ব্যবধানে (প্রায় ২০০০ সাল থেকে) মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্বে আনুমানিক ৩০০ জন মানুষ এবং ৩৮টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে।






