লালনগীতিকে বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের প্রথম প্রয়াণ দিবস আজ। দেশের লোকসংগীতের প্রচার ও প্রসারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘লালনসম্রাজ্ঞী’ হিসেবে সমাদৃত হয়েছিলেন। গত বছরের এই দিনে তিনি পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া সুরের ধারা আজও ভক্তদের হৃদয়ে অমলিন। আজ তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে তার ভক্ত ও অনুসারীরা।
দিনটি উপলক্ষে টেলিভিশন ও বেতারে প্রচার করা হচ্ছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সকাল ৭টায় চ্যানেল আইতে প্রচারিত হয় ‘গান দিয়ে শুরু’ অনুষ্ঠানটি, যেখানে অংশ নেন প্রখ্যাত বংশীবাদক ও ফরিদার জীবনসঙ্গী গাজী আবদুল হাকিম। এছাড়া বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে প্রচারের অপেক্ষায় রয়েছে একটি বিশেষ সাময়িকী, যা পরিচালনা ও উপস্থাপনা করবেন আবদুর রহমান। বাংলাদেশ বেতারেও থাকছে বিশেষ আয়োজন; যেখানে শিল্পী নাসরিন আক্তার বিউটি ও সাজিয়া সুলতানা পুতুল গান পরিবেশন করবেন এবং বাঁশিতে সুরের মূর্ছনা তুলবেন গাজী আবদুল হাকিম।
ফরিদা পারভীনের সংগীতজীবনের শেষভাগের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল নতুন প্রজন্মের হাতে লোকগানের সুর তুলে দেওয়া। এই লক্ষ্যেই প্রায় ১৭ বছর আগে জীবনসঙ্গী গাজী আবদুল হাকিমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সংগীত একাডেমি ‘অচিন পাখি’। আজ সন্ধ্যায় এই একাডেমিতে আয়োজিত স্মরণ অনুষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তার বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের স্মৃতিচারণ করবেন। গাজী আবদুল হাকিমের মতে, বাংলা লোকগানকে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল ফরিদা পারভীনের অন্তিম সাধনা।
ফরিদা পারভীনের জন্ম ১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়ায়। ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতে দীক্ষা নেওয়ার পাশাপাশি নজরুলসংগীত ও ধ্রুপদী সংগীতেও তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর ১৯৭৩ সালে মোকছেদ আলী সাঁইয়ের কাছে ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান শেখার মধ্য দিয়ে তার লালনসংগীত চর্চার শুভ সূচনা ঘটে। এরপর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের মতো গুণী শিল্পীদের সান্নিধ্যে তিনি নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন।
১৯৭৬ সালে ‘অচিন পাখি’ শিরোনামে তার প্রথম লং প্লে রেকর্ড প্রকাশের পর থেকে তিনি লালনগীতির প্রধান কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। তার অসামান্য সংগীতপ্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৭ সালে তাকে একুশে পদক প্রদান করা হয়। এছাড়া ১৯৯৩ সালে শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। দীর্ঘ সংগীতজীবনে অসংখ্য অ্যালবাম ও মঞ্চের মাধ্যমে তিনি লালনের দর্শন ও সুরকে মানুষের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন।
ফরিদা পারভীনের প্রয়াণে সংগীতের এক নক্ষত্রের পতন ঘটলেও তার প্রতিষ্ঠিত ‘অচিন পাখি’র মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মাঝে লোকগানের যে জোয়ার তিনি তৈরি করে গেছেন, তা-ই এখন তার প্রধান উত্তরাধিকার। নতুন কণ্ঠে লোকগানের সুর নিয়মিত ধ্বনিত হওয়ার মাধ্যমেই হয়তো বেঁচে থাকবেন তিনি। তার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ ধরেই বাংলা গান সামনের দিকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংস্কৃতিমনা মানুষজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত বছরের আজকের দিনে তিনি চলে যান অনন্তলোকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শেষ জীবনে প্রতিষ্ঠানটি ঘিরেই ছিল তার বড় স্বপ্ন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হাকিম জানান, ফরিদা পারভীন চাইতেন, বাংলা লোকগান পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়ুক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সুরের সৌন্দর্যে বেড়ে উঠুক প্রজন্মের পর প্রজন্ম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: স্বাধীনতার পর কুষ্টিয়ায় থাকার সময় লালনসংগীতের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে।






