সম্প্রতি ইন্টারনেটে একটি হিসাব বেশ জোরেশোরে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখন মাত্র ১৪ দিনের মতো জ্বালানি তেল মজুত আছে। এই দাবির নেপথ্যে একটি সরল গাণিতিক যুক্তি দেখানো হচ্ছে। সেই হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুতে (এসপিআর) প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল তেল সংরক্ষিত আছে। অন্যদিকে, দেশটিতে প্রতিদিন পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের চাহিদা প্রায় ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল। এই দুটি সংখ্যাকে ভাগ করলে ১৪ দিনের একটি পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।
তবে এই দাবির গাণিতিক কাঠামো ও এর পেছনের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে না। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওর (এনপিআর) গত ১৬ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম মজুত বর্তমানে চার দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। চলতি বছরের শুরুতে এই মজুত ছিল ৪১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল, যা আগস্টের শুরুর দিকে ৩০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে আসে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৮ আগস্টের তথ্য অনুযায়ী, এসপিআরে মজুতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৬৬ লাখ ব্যারেল, যা ১৯৮২ সালের নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই হিসাবটি একটি বিভ্রান্তিকর তুলনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এসপিআর মূলত অপরিশোধিত তেলের জরুরি মজুত, আর প্রতিদিন ২ কোটি ৭ লাখ ব্যারেল ব্যবহারের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা পেট্রল, ডিজেল ও জেট ফুয়েলসহ সব ধরনের পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের সামগ্রিক ব্যবহারের সমষ্টি। ফলে বিষয়টি অনেকটা এমন—কোনো পরিবারের আলমারিতে রাখা জরুরি খাবারের পরিমাণের সাথে পুরো মাসের মোট বাজার খরচের তুলনা করা, যেখানে ফ্রিজের মজুদ বা মুদিদোকানের সহজলভ্যতাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি ব্যবস্থা কেবল এসপিআরের ওপর টিকে নেই। দেশটির এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে। এছাড়া দেশটির বাণিজ্যিক মজুতে আরও প্রায় ৪২ কোটি ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সংরক্ষিত আছে। শোধনাগারগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ব্যারেল তেল পরিশোধন করা হচ্ছে এবং দেশটি নিয়মিত বিশাল পরিমাণ তেল আমদানি-রপ্তানির সাথেও জড়িত।
এসপিআরকে একটি বিমা পলিসির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কেউ বিমার ওপর নির্ভর করে জীবন কাটায় না, তবে বড় ধরনের যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়ার মতো চরম বিপর্যয়ে এটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত চারটি ভূগর্ভস্থ লবণগুহায় এই তেল সংরক্ষিত থাকে, যার মোট ধারণক্ষমতা ৭১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল। ২০২০ সালের শেষ দিকেও সেখানে ৬৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেল ছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জো বাইডেন—উভয়ের মেয়াদকালেই বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতিতে এসপিআর থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে মজুত কমে এসেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র অতি দ্রুত তেলশূন্য হয়ে পড়ার কোনো ঝুঁকির মধ্যে নেই, তবুও এটা অনস্বীকার্য যে আগের তুলনায় জরুরি মজুতের পরিমাণ অনেকটাই কমেছে, যা দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তার খাতিরে উদ্বেগের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ দাবির পক্ষে খুব সরল একটি অঙ্ক কষা হচ্ছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনলাইনে ভাইরাল হওয়া এ হিসাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঠিকই বলা আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু ঝুঁকির হিসাব বা সমালোচনা করার সময় অনেকে এমনভাব দেখান যেন এ জরুরি মজুত ফুরিয়ে যাওয়া মানে পুরো যুক্তরাষ্ট্রের তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সমস্যা হলো, ওই প্রতিবেদনে যে সংখ্যাগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলো আসলে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়কে এক করে পরিমাপ করা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের একটি বিস্তৃত পরিসরের হিসাব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অথচ সেই হিসাবে মুদিদোকানে থাকা পণ্য, বাসার ফ্রিজে থাকা খাবার এবং প্রতিদিন বাড়ির জন্য যে বাজার করা হয়, তা ধরা হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তখন আপনি চাইবেন, সেই পলিসি যেন আপনার হাতে থাকে।






