দীর্ঘ ১২ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতন স্কেল অনুমোদন করেছে সরকার। গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখের বেশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য সুবিধাভোগী নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় আসবেন। এর বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। নতুন কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও বেতন বৃদ্ধির বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। এছাড়া, বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যাদের মাসিক নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা বা তার কম, তাদের পেনশন ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে এবং বিভিন্ন স্তরে ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বেতন কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্য
- নিম্নতম গ্রেড (২০তম): মূল বেতন ২০ হাজার টাকা (পূর্বের তুলনায় ১৪২ শতাংশ বেশি)।
- সর্বোচ্চ গ্রেড (১ম): মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
- পেনশন সুবিধা: সর্বনিম্ন পেনশনধারীদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
বেসরকারি খাতের বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ
সরকারি কর্মীদের বেতন কাঠামোর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হলেও দেশের বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এখনো এমন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো নেই। ফলে সরকারি পে-স্কেল অনুমোদনের পর বেসরকারি খাতের কর্মীদের বেতন ও চাকরির নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে কর্মরত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৯১ লাখ, যার বড় অংশই সরকারি চাকরির বাইরে। বেসরকারি খাতে কোনো একক বেতন কাঠামো না থাকায় প্রতিষ্ঠান, শিল্প, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে বেতন নির্ধারিত হয়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে বেতন কাঠামো উন্নত হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বেতন পর্যালোচনা বা সমন্বয় হয় না।
বেসরকারি কর্মীদের সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগ
- প্রাইভেট সার্ভিস রুলস: বেসরকারি কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার একটি প্রস্তাবিত বিধিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
- পরামর্শ সভা: গত মে মাসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের উপস্থিতিতে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
- প্রস্তাবিত বিষয়: ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র ও বৈষম্য নিরসনের বিষয়গুলো বিধিমালার অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগটি এখনো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে শ্রম আইনের আওতায় শিল্পভিত্তিক ন্যূনতম মজুরি বোর্ড থাকলেও সব পেশার মানুষ এর আওতায় পড়েন না। ব্যাংকার, সফটওয়্যার প্রকৌশলী বা সাংবাদিকের মতো পেশায় এই সুরক্ষার অভাব প্রকট। ড. সেলিম রায়হান বলেন, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়তে হলে দেশের কয়েক কোটি বেসরকারি কর্মীর স্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্র সবার এবং উন্নয়নের সুফল সবার জন্য সমানভাবে পৌঁছানো উচিত। সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানও বেসরকারি কর্মীদের জন্য ন্যূনতম কর্মসংস্থান মানদণ্ড, নিয়মিত বেতন পর্যালোচনা ও অবসরকালীন সুরক্ষার একটি কার্যকর কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকারি পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাবে বেসরকারি কর্মীদের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক বার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, সরকারি পে-স্কেলের সরাসরি প্রভাবের চেয়ে বেসরকারি শ্রমবাজারে মজুরি ও উৎপাদনশীলতার সমন্বয় সাধনই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। চাকরির আরও তথ্য: নতুন কাঠামোয় ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর মধ্যে কৃষিতে প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ, শিল্পে ১ কোটি ২০ লাখ এবং সেবা খাতে ২ কোটি ৬২ লাখ মানুষ কাজ করেন। চাকরির আরও তথ্য: তবে এদের সবাইকে বেসরকারি চাকরিজীবী বলা যাবে না। চাকরির আরও তথ্য: কৃষক, স্বনিযুক্ত ব্যক্তি, পারিবারিক শ্রমিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক বেসরকারি চাকরিজীবীদের আলাদা করে দেখতে হয়। চাকরির আরও তথ্য: আবার ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিভিন্ন সেবা খাত ও খুচরা ব্যবসায় কর্মীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধার কাঠামো ভিন্ন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, স্বাস্থ্যবিমা ও উৎসব বোনাস থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানে এসব সুবিধা নেই।






