কিশোর আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ফাতেমা: বিয়ন্ড দ্য ওয়েভস’-এর শুটিংয়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন পরিচালক আশিক ইব্রাহীম। এই প্রামাণ্যচিত্রের মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি গল্প তুলে ধরা, যেখানে নারীদের সাহসিকতা, প্রতিকূলতা পেরিয়ে নিজস্ব অবস্থান তৈরির লড়াই ফুটে উঠবে। কক্সবাজারের তরুণ সার্ফার ফাতেমা আক্তারের জীবন নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্তটি তাই ছিল খুবই প্রাসঙ্গিক। শুটিংয়ের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পর দীর্ঘ আলাপে ফাতেমার অদম্য মানসিকতার পরিচয় পান নির্মাতা। ফোনে আগে কথা হয়েছে, তবে শুটিংয়ের আগের দিন কক্সবাজারে প্রথমবার সামনাসামনি ফাতেমার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ। শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে তার সঙ্গে কথা চলতে থাকে।
১৬ বছর বয়সী ফাতেমার আত্মবিশ্বাস ও নিজের জীবন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা মুগ্ধ করার মতো। মহেশখালীর এই কিশোরী ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে অভাব-অনটনের সঙ্গে লড়াই করেছেন। সার্ফিংয়ে নিজের জায়গা করে নেওয়া তার জন্য কেবল শারীরিক সক্ষমতার লড়াই ছিল না, ছিল সামাজিক ও পারিবারিক বাধা পেরোনোর এক কঠোর সংগ্রাম। ফাতেমার সার্ফিং সঙ্গী আরও অনেক মেয়েই সামাজিক চাপে কিংবা সংসারের টানাপোড়েনে ছিটকে পড়েছেন। অনেকেই তাকে বিদায়ের সময় বলে গেছেন যেন সে কোনোভাবেই সার্ফিং ছেড়ে না দেয়। এই কথাটিই ফাতেমার কাছে এক বিরাট দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে; যারা স্বপ্ন পূরণ করতে পারেনি, তাদের অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো যেন সে নিজেই বহন করছে। ১৬ বছরের মেয়েটির কথায় আশ্চর্য আত্মবিশ্বাস। কোথাও বাড়তি আবেগ নেই, আবার নিজের লড়াই লুকিয়ে রাখার চেষ্টাও নেই। কয়েক মিনিট কথা বলার পরই মনে হয়েছিল, ক্যামেরার সামনে শুধু একজন সার্ফারকে পাওয়া যাবে না, পাওয়া যাবে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই ঠিক করতে চাওয়া এক কিশোরীর গল্প। শৈশব, পরিবার, বেড়ে ওঠা, সার্ফিং, অভাব, সামাজিক বাধা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন—একটির পর একটি গল্প যেন খুলে যাচ্ছিল। কিন্তু শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, মেয়ে হয়ে সার্ফিংয়ের মতো একটি খেলায় টিকে থাকাটাও তার জন্য সহজ ছিল না।
সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর বোর্ডের ভারসাম্য বজায় রাখা যেমন কঠিন, জীবনের প্রতিটি বাঁক সামলানোও ফাতেমার জন্য সমান চ্যালেঞ্জিং। প্রতিটি ঢেউ ধরার জন্য যেমন সঠিক সময় ও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তেমনই প্রতিটি প্রতিকূলতায় দমে না গিয়ে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন এই কিশোরী। অনুশীলনের পাশাপাশি নিজের পড়াশোনাও নিয়মিত চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি, কারণ তার লক্ষ্য কেবল দক্ষ সার্ফার হওয়া নয়, বরং নিজের জন্য একটি সুনিশ্চিত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।
ফাতেমার এই লড়াকু মানসিকতার বড় স্বীকৃতি এসেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। ভারতের তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান সার্ফিং চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের হয়ে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতায়, এবার জাপানে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। কক্সবাজার থেকে জাপানের আইচি-নাগোয়া পর্যন্ত তার এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত অর্জনের নয়, বরং বাংলাদেশের নারী সার্ফিংয়ের সম্ভাবনাকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার সুযোগ। সঙ্গে সঙ্গে কক্সবাজার প্রতিবেদক আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে যোগাযোগ করি।
তবে এই অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখতে উন্নত প্রশিক্ষণ, মানসম্মত সার্ফিং বোর্ড এবং নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতার প্রয়োজন বলে মনে করেন নির্মাতা। শুটিংয়ের দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় পরিচালকের বারবার মনে হয়েছে, ফাতেমার অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি পদক জয়ের চেয়েও বেশি—সেটি হলো তার জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার অসীম সাহস।
সকাল থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময়ের শুটিং শেষে যখন সৈকতের আলো ও পরিবেশ বদলে যাচ্ছে, তখনও ফাতেমাকে দেখা গেছে বোর্ড হাতে সমুদ্রের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে। তার এই একনিষ্ঠতা এবং অজানাকে জানার নেশাই তাকে আরও বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস সবার। তার মতো আরও অনেক মেয়ের জন্য তিনি প্রেরণার এক বাতিঘর হয়ে উঠছেন।






