বাড়ির ড্রয়িংরুমের শোকেসের ভেতর সারি সারি কাচের প্লেট, বাটি, কাপ-পিরিচ কিংবা গ্লাস সাজানো থাকে। কোনোটিতে সূক্ষ্ম ফুলের নকশা, কোনোটির পাড়ে সোনালি রঙের কারুকাজ। এসব বাসনকোসন হয়তো কোনো উপহার, বিয়ের নজরানা কিংবা বিদেশ থেকে আনা শৌখিন সামগ্রী। অথচ দশকের পর দশক পার হলেও এসবের অধিকাংশ ব্যবহারের সুযোগ মেলে না। কারণ, এগুলো বিশেষ কোনো দিনের অপেক্ষায় বা কেবল মেহমানের জন্য তুলে রাখা হয়। প্রতিশ্রুতির পরও থামছে না ‘মব’ সহিংসতায় মৃত্যু। কোনোটায় ফুল আঁকা, কোনোটার পাড় সোনালি। তার ভাষ্য, ‘সুন্দর প্লেট-বাটি-গ্লাসে খেলে নিজেকেই স্পেশাল লাগে।
রাজধানীর ইস্কাটনের বাসিন্দা ৩৬ বছর বয়সী নাফিয়া জাহান মুন্নি ছোটবেলা থেকেই মায়ের মধ্যে এই অভ্যাস দেখে বড় হয়েছেন। তিনি জানান, তাদের ঘরেও মেহমান না আসা পর্যন্ত শৌখিন বাসনপত্র শোকেস থেকে বের করা হতো না। বাবার দুবাই থেকে আনা সুন্দর সুন্দর বাসন ব্যবহারের সুযোগ তার মায়ের ক্ষেত্রে তেমন একটা মিলত না। শৈশবে মুন্নির এই বিষয়টি ভালো লাগত না, কারণ তিনি নিজেকেও পরিবারের সদস্য হিসেবে মেহমানের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন না। তবে বর্তমানে মুন্নি নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন। এখন তিনি নিজের এবং অতিথিদের জন্য সমানভাবে ভালো জিনিস ব্যবহার করতে পছন্দ করেন, যা সময় পরিবর্তনেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। রাজধানীর ইস্কাটন এলাকায় থাকেন বেসরকারি চাকরিজীবী নাফিয়া জাহান মুন্নি (৩৬)। ছোটবেলায় মায়ের এই অভ্যাস দেখেছেন খুব কাছ থেকে। মুন্নি বলেন, ‘আমি ভাবতাম, বড় হয়ে নিজে যখন ভালো জিনিস কিনব, সেগুলোতেই খাব। মেহমানদের জন্য যেমন সুন্দর বাসন বের করি, নিজেদের জন্যও করি।’। আমাদের মা-খালা, ফুফু, নানি-দাদিদের অনেকের ঘরেই ছিল এমন শোকেস। পরিবারের কেউ সেগুলো ব্যবহার করতে চাইলে উত্তর আসত, ‘ওটা নামাস না, মেহমানের জন্য।’। আগের প্রজন্মের অনেকের জীবন আজকের তুলনায় কম ভোগ্যপণ্যনির্ভর ছিল। একসময় একটা ভালো বাসন সেট কিনে সেটা বহু বছর ব্যবহার করার পরিকল্পনা করাই ছিল স্বাভাবিক। ফলে ভালো জিনিস বাঁচিয়ে রাখতে হবে, এই শিক্ষা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে চলে আসা অস্বাভাবিক নয়।
তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ার বাসিন্দা তাসলিমা আক্তারও একই ঘরানার।
তার শোকেসে সাজানো শৌখিন বাসনপত্র তার কিশোরী মেয়ে মৌমিতা তাসনিম পারি মাঝেমধ্যে ব্যবহার করতে চাইলে তাসলিমা বাধা দেন। তার যুক্তি, এগুলো দামি এবং নিয়মিত ব্যবহার করলে ভেঙে যাওয়ার বা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কেবল বিশেষ দিন বা অতিথির আপ্যায়নেই এগুলো ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ থাকে। সাবেকুন নাহার সাদিয়ার মা নূরজাহান বেগমও মনে করেন, নিয়মিত ব্যবহার করলে এসব কাচের জিনিস ভেঙে আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। মেহমান রোজ আসে না বলেই তাদের জন্য ভালো বাসন রাখা জরুরি বলে তিনি মনে করেন। একই ধারণা পোষণ করেন ৫০ বছর বয়সী সীতা রানী দাশ, যিনি মনে করেন দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য সাধারণ প্লেটই যথেষ্ট, ভালো জিনিস প্রতিদিন ব্যবহার করা অসুবিধাজনক। ‘ইউনিফর্মধারীদের ধাওয়ায় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন’—দীপের বক্তব্যে ‘আশ্বস্ত’ হতে পারছে না পিবিআই। মাহফুজ আনামের কলাম / কেবলমাত্র নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে। আমরা সেগুলোতে খেতে চাইলে মা দিতেন না।’। আর এলে তাদের ভালো জিনিসে খেতে দিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া সুপর্ণ দাশের মা সীতা রানী দাশের (৫০) ভাবনাও প্রায় একই। গবেষণাটি বাংলাদেশি পরিবারগুলোতে শোকেসে বাসন তুলে রাখা-না রাখার প্রবণতা নিয়ে করা হয়নি।
তবে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ২৭ বছর বয়সী আইরিন আহমেদ। তিনি বিশ্বাস করেন, সুন্দর জিনিস ব্যবহারের জন্য বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন নেই। সুন্দর পাত্রে খাবার পরিবেশন করলে তা তৃপ্তি ও মানসিক আনন্দ দেয়, এমনকি সাধারণ ভর্তা-ভাতও তখন বিশেষ মনে হয়। এই মানসিকতা কেবল বাসনপত্রের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; শাড়ি, দামি জুতা কিংবা শোভাবর্ধক ঘর সাজানোর জিনিসের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়।
ভোক্তা মনোবিজ্ঞানে এই আচরণের কারণ নিয়ে বেশ কিছু গবেষণা রয়েছে। মনোবিজ্ঞানের কয়েকজন শিক্ষককে এমন আচরণের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তারা বলেন, বিষয়টা তাদেরও ভাবিয়েছে।
২০১৮ সালে ‘জার্নাল অব মার্কেটিং বিহেভিয়ার’-এ প্রকাশিত ‘অকেশন ম্যাচিং অব ইনডালজেন্সেস’ শীর্ষক গবেষণায় শু ও শরিফ দেখিয়েছেন, মানুষ অনেক সময় বিশেষ কোনো জিনিস বা সুযোগ পেলেও তা ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য রেখে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত ব্যবহারই হয় না।
এর সঙ্গে ‘স্কারসিটি মাইন্ডসেট’ বা অভাববোধের মানসিকতাও যুক্ত। এই তত্ত্বকে পরবর্তী গবেষণাগুলোও বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছে।
হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেন্ধিল মুল্লাইনাথান ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের এলদার শাফির তাদের ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘স্কারসিটি: হোয়াই হ্যাভিং টু লিটল মিনস সো মাচ’ বইতে অভাবের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লস অ্যাঞ্জেলেস ক্যাম্পাসের অধ্যাপক সুজান বি।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, অভাবের অভিজ্ঞতা মানুষের খরচ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রবণতার পেছনে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে ভালো মানের বাসনপত্র কেনা একসময় বড় বিনিয়োগের মতো ছিল, যা ভেঙে গেলে সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব ছিল না। এছাড়া ১৮৯৯ সালে থর্স্টেইন ভেবলেন তার ‘দ্য থিওরি অব দ্য লেজার ক্লাস’ গ্রন্থে ‘কনস্পিকুয়াস কনজাম্পশন’ বা প্রদর্শনমূলক ভোগের যে ধারণা দিয়েছিলেন, তা আধুনিক সমাজেও প্রাসঙ্গিক। ২০২২ সালে ‘জার্নাল অব রিটেইলিং’-এ প্রকাশিত পর্যালোচনা অনুযায়ী, দামি সামগ্রী ব্যবহার বা প্রদর্শন সামাজিক মর্যাদা ও গুরুত্বের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। অতিথিদের ভালো প্লেটে খাবার দেওয়া মানে কেবল জিনিস দেখানো নয়, বরং তাদের বিশেষ মর্যাদা প্রদান করাও বটে। নরওয়েজীয়-আমেরিকান অর্থনীতিবিদ ও সমাজতাত্ত্বিক থর্স্টেইন ভেবলেন ১৮৯৯ সালে তার প্রকাশিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য থিওরি অব দ্য লেজার ক্লাস’-এ এই ধারণাটি সামনে আনেন।
পারিবারিক ঐতিহ্যে ঘরকন্নার দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে নারীদের ওপর থাকায় এই অভ্যাসগুলো মূলত তাদের মাধ্যমেই চর্চিত হয়ে আসছে। এটি কখনো ভালোবাসা আবার কখনো ত্যাগ বা কৃচ্ছ্রতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। তবে এই শৌখিন বাসনপত্র দীর্ঘ অপেক্ষায় থেকে একসময় পুরোনো হয়ে যায় বা ভেঙে যায়, অথচ ব্যবহারের স্বাদ অপূর্ণই রয়ে যায়। সন্তানেরা বড় হয়ে একসময় ঘর ছেড়ে দূরে চলে যায়, পরিবারের কাঠামো বদলে যায়, কিন্তু সেই শোকেসের সোনালি পাড়ওয়ালা প্লেটগুলো ব্যবহারের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘বিশেষ দিন’ হয়তো কখনোই আর আসে না। আবার কোনোটা মা-বাবা শখ করে কিনেছিলেন।






