পাহাড়ের জুমচাষ কি বিলুপ্তির পথে, নাকি প্রয়োজন আধুনিক বৈজ্ঞানিক রূপান্তর?

প্রকাশ:
Print news

জুমচাষ বা শিফটিং কাল্টিভেশন, যা স্ল্যাশ-অ্যান্ড-বার্ন পদ্ধতি হিসেবেও পরিচিত, হাজার বছরের পুরোনো একটি কৃষি কৌশল। বিশ্বের উষ্ণ ও আর্দ্র পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী সমাজগুলো ঐতিহাসিকভাবে এই পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশসহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, পাপুয়া নিউগিনি, কঙ্গো অববাহিকা এবং আমাজন অঞ্চলের বহু আদিবাসী আজও এই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে আসছেন। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তবে এর উত্তরটি মোটেও সরল নয়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জুমচাষের রূপ পরিবর্তিত হয়েছে বা সংকুচিত হয়েছে। তবে এই পরিবর্তন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কৃষকের নিজস্ব সিদ্ধান্তে ঘটেনি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমির ওপর চাপ, কঠোর বন সংরক্ষণ আইন, স্থায়ী বসতি স্থাপনের সরকারি নীতি, বাণিজ্যিক কৃষির বিস্তার, সড়ক নির্মাণ এবং বাজার অর্থনীতির প্রসারের মতো বহুমুখী চাপে জুমের ঐতিহ্যগত কাঠামো সংকুচিত হয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘ পতিতকালভিত্তিক জুমচাষের স্থায়িত্ব নষ্ট হওয়ার পেছনে রাষ্ট্রের নীতিগত পরিবর্তন ও ভূমি ব্যবহারের রূপান্তরকে গবেষকেরা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

জুমচাষ কমে যাওয়ার পর অনেক জায়গায় স্থায়ী কৃষি, সোপান কৃষি, অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি বা ফলবাগানের মতো পদ্ধতি চালু হয়েছে। রাবার, অয়েলপাম, কফি বা কোকোর মতো অর্থকরী এক ফসলি চাষাবাদে কৃষকের নগদ আয় বাড়লেও এর সামাজিক ও পরিবেশগত নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। স্থানীয় বীজের বৈচিত্র্য ও খাদ্যাভ্যাসের বৈচিত্র্য কমেছে, বাজারনির্ভরতা বেড়েছে এবং অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি ও সাংস্কৃতিক জ্ঞান হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।

পরিবেশগত দিক থেকেও এক ফসলি বাগান প্রাকৃতিক বনের বিকল্প হতে পারে না। প্রাকৃতিক বন কেটে রাবার বা অয়েলপাম বাগান করলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায়, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল সংকুচিত হয় এবং মাটির জৈবগুণ কমে যায়। এছাড়া রোগবালাই ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। বিপরীতে, দীর্ঘ পতিতকালভিত্তিক ঐতিহ্যগত জুমে জমি ব্যবহারের পর পুনরায় বন গজানোর সুযোগ থাকে। গবেষণা অনুযায়ী, পতিতকাল যথেষ্ট দীর্ঘ হলে বন পুনরায় তার উর্বরতা ও পরিবেশগত কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করতে পারে। সমস্যাটি জুমের নয়, বরং ভারসাম্যহীন জুমচাষের, যেখানে পতিতকাল পাঁচ থেকে সাত বছরের নিচে নেমে এলে মাটির ক্ষয় ও উৎপাদন হ্রাসের মতো সংকট দেখা দেয়।

বর্তমান সময়ে ‘রিজেনারেটিভ অ্যাগ্রিকালচার’ বা পুনর্জাগরণমূলক কৃষির ধারণাটি বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এর লক্ষ্য মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ এবং কার্বন ধারণের মাধ্যমে কৃষিকে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। মজার বিষয় হলো, ঐতিহ্যগত জুমের সাথে এই আধুনিক ধারণার অনেক মৌলিক মিল রয়েছে। বহু ফসলি চাষ, স্থানীয় বীজের ব্যবহার এবং বন ও কৃষির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক জুমের ঐতিহ্যগত শক্তি।

আধুনিক পুনর্জাগরণমূলক কৃষি আগুনের ব্যবহার কমিয়ে স্থায়ী ভূমি আচ্ছাদন, জৈব সার, কম্পোস্ট এবং বৈজ্ঞানিক পানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেয়। আন্তর্জাতিক গবেষকেরা এখন ‘জুম বনাম আধুনিক কৃষি’ বিতর্কের বাইরে এসে ‘উন্নত জুম’ বা বৈজ্ঞানিক সমন্বয়ের কথা বলছেন। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে অস্বীকার না করে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তার মেলবন্ধন ঘটানোই কার্যকর পথ হতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে জুমকে বিলুপ্ত না করে একে আধুনিকায়ন করা সম্ভব। বহু ফসলি ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন রেখে দেশীয় বৃক্ষভিত্তিক অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি, কমিউনিটি সিড ব্যাংক, জৈব সার, সীমিত অগ্নিব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল জাতের উন্নয়ন ঘটিয়ে একটি ‘রিজেনারেটিভ জুম মডেল’ তৈরি করা যেতে পারে। এটি পাহাড়ের পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করবে।

পরিশেষে, প্রশ্নটি জুম থাকবে কি না তা নয়, বরং পাহাড়ের মাটি, বন ও মানুষের জীবন কীভাবে একসঙ্গে টিকে থাকবে সেটিই মুখ্য। বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, যেখানে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জ্ঞানকে উপেক্ষা করা হয়েছে, সেখানে পরিবেশ ও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ জুমের অবসানে নয়, বরং এর বৈজ্ঞানিক পুনর্জাগরণেই নিহিত। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদ মিসবাহুজ্জামান এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

শেয়ার করুন