১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহের মরদেহ। সেই বিকেলের খবরটি মুহূর্তের মধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তার প্রস্থান আজও ভক্তদের মনে এক গভীর ক্ষত হয়ে আছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার মৃত্যুর রহস্য নিয়ে বিতর্ক ও আইনি লড়াই এখনো চলমান। সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তে এটিকে আত্মহত্যার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, তার পরিবারের পক্ষ থেকে বরাবরই হত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ সিনেমার মাধ্যমে রূপালি পর্দায় চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমনের অভিষেক ঘটে, যিনি পরবর্তীতে সালমান শাহ নামে পরিচিতি পান। প্রথম সিনেমাতেই তিনি দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। এরপর মাত্র তিন বছরের সংক্ষিপ্ত চলচ্চিত্র জীবনে তিনি উপহার দিয়েছেন ২৭টি সিনেমা। তখনকার বাণিজ্যিক ধারার চলচ্চিত্রের প্রথাগত উচ্চস্বরে সংলাপ ও অতিরঞ্জিত অভিনয়ের বিপরীতে সালমান শাহ নিয়ে এসেছিলেন এক নতুন ঘরানা। তার স্বাভাবিক অভিনয়, সাবলীল হাসি এবং চরিত্রের গভীরে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে সমসাময়িক নায়কদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
সালমান শাহ অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার তালিকায় রয়েছে ‘দেন মোহর’, ‘সুজন সখী’, ‘তুমি আমার’, ‘এই ঘর এই সংসার’, ‘প্রিয়জন’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘তোমাকে চাই’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’ এবং ‘আনন্দ অশ্রু’। প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে শাবনূরের সঙ্গে তার জুটি ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সফল এক রসায়ন। তারা একসঙ্গে ১৪টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। তাদের অনস্ক্রিন রসায়ন নিয়ে আজও দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা হয়, অনেকেই মন্তব্য করেন, “এমন কেমিস্ট্রি আর হয়নি।”
অভিনয়ের পাশাপাশি ফ্যাশন সচেতন তরুণদের কাছেও সালমান শাহ ছিলেন এক আইকন। তার ব্যবহৃত চামড়ার জ্যাকেট, ডেনিম জিন্স, ক্যাপ, সানগ্লাস কিংবা গলার স্কার্ফ সেই নব্বইয়ের দশকে তরুণ প্রজন্মের ফ্যাশন ট্রেন্ড বদলে দিয়েছিল। কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ইনফ্লুয়েন্সার ছাড়াই তিনি তার স্টাইল দিয়ে লাখো মানুষের রুচি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন সংগীতপ্রেমী, গিটার ও হারমোনিকা বাজাতে পারতেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত।
আজকের ওটিটি বা ইউটিউবের যুগেও সালমান শাহর সিনেমার আবেদন কমেনি। নতুন প্রজন্মের দর্শক যখন তার সিনেমা দেখে, তখন তারা তার অভিনয়ের স্বাভাবিকতায় মুগ্ধ হয়। তার অভিনীত চরিত্রগুলো অতিমানবীয় ছিল না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনের আনন্দ-বেদনার প্রতিফলন ছিল। হয়তো এই কারণেই সময় বদলালেও তার জনপ্রিয়তা অম্লান। অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, “এমন নায়ক আর আসেনি” কিংবা “তিনি বেঁচে থাকলে বাংলা সিনেমার গল্প অন্যরকম হতো।”
সালমান শাহ প্রমাণ করে গেছেন যে, কিংবদন্তি হওয়ার জন্য দীর্ঘ জীবনের প্রয়োজন নেই। মাত্র ২৭টি সিনেমা একটি জাতির মনে ও মননে যে স্থায়ী ঠিকানা তৈরি করেছে, তা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল। তিনি চলে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কাজগুলো আজও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে অগণিত ভক্তের হৃদয়ে। তার অকাল প্রস্থান বাংলা সিনেমার জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি, যা আজও পূরণ হয়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ঢাকার ইস্কাটনের একটি অ্যাপার্টমেন্টের সামনে মানুষের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ বিশ্বাস করতে পারছে না, কেউ কান্না চেপে রাখতে পারছে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অথচ খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে—সালমান শাহ নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশের সিনেমা সেদিন শুধু একজন নায়ককে হারায়নি; হারিয়েছিল এমন এক মুখ, যে মুখে নব্বইয়ের দশকের একটি প্রজন্ম নিজেদের স্বপ্ন দেখত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাত্র ২৪ বছরের জীবন, তিন বছরের চলচ্চিত্রজীবন আর ২৭টি সিনেমা; এই সংখ্যাগুলো আশ্চর্য রকম ছোট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অথচ এমন ছোট্ট ক্যারিয়ারেই তিনি এমন এক উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, যা তিন দশক পরও মুছে যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইউটিউবে তার সিনেমার গান কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নতুন প্রজন্মও তাকে চিনে—নস্টালজিয়ার কারণে নয়, বরং তার অভিনয়ের স্বাভাবিকতা আজও পুরোনো মনে হয় না বলেই।






