মার্ক টোয়েনের সেই বিখ্যাত উক্তিটি প্রায়ই প্রবাদের মতো শোনা যায়—পরিসংখ্যান তিন প্রকার: মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা ও পরিসংখ্যান। ক্রিকেটের মতো খেলায় যেখানে সংখ্যার আধিক্য সবচেয়ে বেশি, সেখানেও এই কথাটি মাঝে মাঝে সত্য হয়ে ওঠে। পরিসংখ্যান অনেক সময় বিভ্রান্তি ছড়ায়, যেমন টেস্ট ক্রিকেটে ৮ সেঞ্চুরি ও ৩৯.০৪ ব্যাটিং গড় দিয়ে ভিক্টর ট্রাম্পারকে বিচার করতে গেলে যে কেউ ক্রিকেট-মূর্খ হিসেবে গণ্য হবেন। তবে ডন ব্র্যাডম্যানের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান কোনো ধোঁকা নয়, বরং তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের অকাট্য দলিল।
ব্যাটিংয়ের মতো অনিশ্চিত একটি কাজকে ব্র্যাডম্যান দুই আর দুইয়ে চারের মতো নিশ্চিত করে তুলেছিলেন। তাঁর ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানগুলো বিস্ময়কর। ৩৩৮টি প্রথম শ্রেণির ইনিংসের মধ্যে ২২১টিতে তিনি সেঞ্চুরি পাননি, তবুও সেই ইনিংসগুলোর গড় ছিল ৫৮.২০। ১১৭টি ইনিংসে তিনি সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন। যদি তিনি কেবল সেঞ্চুরি করেই আউট হয়ে যেতেন, তবে তাঁর গড় হতো ৬১.১৪। কিন্তু অসংখ্য ডাবল, ট্রিপল এবং একটি কোয়াড্রপল সেঞ্চুরির সুবাদে তাঁর গড় দাঁড়িয়েছে ৯৫.১৪।
এত সব সংখ্যার ভিড়েও ব্র্যাডম্যানের আসল পরিচয় তাঁর ৯৯.৯৪ টেস্ট ব্যাটিং গড়। এটি এমন এক বিস্ময়কর সংখ্যা যে, দুঃসাহসী কল্পনাও একে ছোঁয়ার সাহস পায় না। যুগে যুগে ব্যাটসম্যানরা এই অস্পর্শনীয় উচ্চতার কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন মাত্র। বিখ্যাত অঙ্কবিদ টমাস হার্ডি ‘ব্র্যাডম্যান ক্লাস’ নামে একটি পরিভাষা তৈরি করেছিলেন, যা গ্যালিলিও, নিউটন বা আইনস্টাইনের মতো মানবীয় কীর্তির মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
ইংল্যান্ডে প্রথম সফরে ব্র্যাডম্যানের দুটি রেকর্ড অমরত্ব পেয়েছে। এক সিরিজে ৫ টেস্টে ৯৭৪ রান করার চেয়েও বিস্ময়কর ছিল লিডসে এক দিনে ৩০৯ রান। লাঞ্চের সময় ১০৫ ও চা-বিরতির সময় ২২০ রানে অপরাজিত থাকা ব্র্যাডম্যান প্রথম দিনের দুই সেশনেই সেঞ্চুরি করেছিলেন। দিন শেষে ৩০৯ রানে অপরাজিত থেকে তিনি বলেছিলেন, ‘নাইস ওয়ার্ক আউট ফর টুমরো।’ পরের দিন ৩৩৪ রান করে আউট হয়েছিলেন তিনি। এর আগে অস্ট্রেলিয়ায় শেফিল্ড শিল্ডে ৪৫২ রান করেছিলেন তিনি।
১৯৩০ সালের ইংল্যান্ড সফরে ব্র্যাডম্যানের এই ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকাতেই কুখ্যাত ‘বডিলাইন’ বোলিং কৌশলের জন্ম হয়। লেগ সাইডে ফিল্ডার সাজিয়ে ব্যাটসম্যানের শরীর লক্ষ্য করে বোলিং করার সেই কৌশলে হ্যারল্ড লারউড ও ডগলাস জার্ডিন সফল হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ব্র্যাডম্যানের ক্যারিয়ারের আটটি সোনালি বছর হারিয়ে যায়। যুদ্ধের পর ৩৮ বছর বয়সে ফিরে এসেও তিনি শেষ তিন সিরিজে ৯৭.১৪, ১৭৮.৭৫ ও ৭২.৫৭ গড়ে রান করেছেন। যুদ্ধের পর ১৫ টেস্টে তাঁর ৮টি সেঞ্চুরি ছিল অবিশ্বাস্য এক ঘটনা।
মানুষ হিসেবেও ব্র্যাডম্যান ছিলেন বিরল। তাঁর আত্মজীবনীতে তিনি সমালোচকদের প্রতিটি মন্তব্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জবাব দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন পারফেকশনিস্ট। কোনো বক্তব্য দেওয়ার আগে বাড়িতে গ্রামোফোনে রেকর্ড করে রিহার্সাল দিতেন। তাঁর স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। তাঁর জীবনীকার রোনাল্ড পেরির সঙ্গে সাত ঘণ্টার ইন্টারভিউতে তিনি একটিও অপ্রাসঙ্গিক শব্দ উচ্চারণ করেননি। এমনকি পাণ্ডুলিপির আড়াই লাখ শব্দের মধ্যে ৮০টি পয়েন্ট নিয়ে তিনি পেরি’র সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন, যার বেশিরভাগই ছিল পরিসংখ্যানগত ভুল।
ব্র্যাডম্যানের স্মৃতিশক্তির একটি উদাহরণ হলো, একটি শট মিড-অন না মিড-অফ ছিল—তা নিয়ে তর্কের সময় তিনি চোখ বন্ধ করে শটটি মনে মনে খেলে বলেছিলেন, ‘না, এটা মিড-অফেই ছিল।’ ১৯৩১ সালে ব্ল্যাকহিথে কংক্রিট পিচের উদ্বোধনী ম্যাচে ২২ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি। সেই ম্যাচে ১০টি ছক্কা ও ৯টি চার মেরেছিলেন। অথচ পুরো টেস্ট ক্যারিয়ারে তাঁর ছক্কার সংখ্যা মাত্র ৬টি। সেই ম্যাচে হরি বেকার নামের এক বোলার প্রথম ওভারেই ৪০ রান দেওয়ার পর আর বোলিং না করার জন্য অধিনায়কের কাছে কাকুতিমিনতি করেছিলেন।
ব্র্যাডম্যানের ব্যবহৃত সেই ব্যাটটি বাউরালের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ব্যাটটি দেখতে বেশ সাধারণ, যা দেখে তাঁর ব্যাটিং দক্ষতা নিয়ে বিস্ময় আরও বাড়ে। সম্প্রতি তাঁর ব্যবহৃত একটি ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ প্রায় ৩ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। ১৯০৮ সালের ২৭ আগস্ট পৃথিবীতে আসা এই কিংবদন্তি আজও ক্রিকেটের অবিসংবাদিত সম্রাট হয়ে আছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যে খেলাতে পরিসংখ্যান নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি চর্চা, সেই ক্রিকেটের ক্ষেত্রেও কথাটা কখনো কখনো সত্যি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্র্যাডম্যান কী ছিলেন, তা বুঝতে পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ব্যাটিংয়ের মতো ভাগ্যনির্ভর অনিশ্চিত একটা কাজকে এমনই দুই আর দুইয়ে চারের মতো বানিয়ে ফেলেছিলেন যে ভাবলে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যা জ্যাক হবস, ওয়ালি হ্যামন্ড, রণজিৎ সিংজি, সিবি ফ্রাই, গ্যারি সোবার্স, ভিভ রিচার্ডস ও জিওফ বয়কটের মতো গ্রেটদের সেঞ্চুরিসহ ব্যাটিং গড়ের চেয়েও বেশি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেহেতু এর অনেকগুলো ডাবল ও ট্রিপল হয়েছে, একটি কোয়াড্রপলও, গড় দাঁড়িয়েছে ৯৫.১৪। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এত সব সংখ্যার ভিড়েও শেষ পর্যন্ত ব্র্যাডম্যানের আসল পরিচয় অবশ্যই ৯৯.৯৪। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আশ্চর্যই বলতে হবে, দশমিক-টশমিকসংবলিত জটিল এই সংখ্যাটাই মুখে মুখে ফিরতে ফিরতে পরিণত ক্রিকেটের সবচেয়ে মুখস্থ অঙ্কে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যেটি বলামাত্র বোঝা হয়ে যায় কার কথা হচ্ছে।






