প্রতিটি সংসদীয় আসনে দুটি করে মোট ৬০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্যাডেট কলেজের আদলে গড়ে তোলার একটি সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে সম্প্রতি আলোচনা হয়েছিল। শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন জানিয়েছিলেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক প্রাক্কলন অনুযায়ী, এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৬৮ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, যা বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল। এছাড়া প্রতিটি শিক্ষার্থীর পেছনে বার্ষিক প্রায় ৬ লাখ টাকা আবর্তক ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার সম্ভবত এই প্রকল্প থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ক্যাডেট কলেজের সুবিধাভোগী হিসেবে আমি জানি, ৩০০ শিক্ষার্থীর জন্য ৩০ জন শিক্ষক ও শতাধিক কর্মচারীর যে অনুপাত সেখানে থাকে, তা দেশের সব শিশুর জন্য নিশ্চিত করা গেলে তা হতো অনন্য। তবে সেই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার আগে আমাদের বিদ্যমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার করুণ দশা খতিয়ে দেখা জরুরি। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ২১ হাজার ৮৬টি জুনিয়র ও হাইস্কুল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৬৯১টি সরকারি, যেখানে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৬৮১ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। অন্যদিকে, ১৯ হাজার ৭৫৭টি বেসরকারি স্কুলের ৮৭ লাখ শিক্ষার্থীর বড় অংশই এমপিওভুক্ত বা এমপিওহীন প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি ও এমপিওভুক্ত স্কুলের মধ্যে মাথাপিছু ব্যয়ের আকাশ-পাতাল পার্থক্য শিক্ষার বৈষম্যকে প্রকট করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, নরসিংদীর একটি এমপিওভুক্ত স্কুলে মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় ৯ হাজার ৭০০ টাকা হলেও, সরকারি স্কুলে তা ২৮ হাজার ৮০০ থেকে ৩৩ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবস্থাও নাজুক; সরকারি পরিদর্শনই বলছে, ৮৮ শতাংশ স্কুলের মান সন্তোষজনক নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেও বাংলা ও ইংরেজি পড়তে হিমশিম খায়। এই ব্যর্থতা শিশুদের নয়, বরং রাষ্ট্র ও ব্যবস্থাপনার।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় যে ‘বর্ণবৈষম্য’ তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে এখনই। প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ষষ্ঠ শ্রেণিকে প্রাথমিকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে প্রতিটি স্কুলে অন্তত দুজন করে দক্ষ ইংরেজি ও গণিত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। মাধ্যমিক পর্যায়ে ৮৭ লাখ সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীর জন্য এমপিওভুক্তির আওতা বাড়ানো এবং পর্যায়ক্রমে সব মাধ্যমিক স্কুল সরকারীকরণের দিকে এগোতে হবে। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে তারা পাঠদানে মনোযোগী হতে পারবেন না।
মাধ্যমিকের ৮৭ লাখ শিক্ষার্থীর পেছনে মাথাপিছু ৬ লাখ টাকা ব্যয় অসম্ভব মনে হলেও, সরকারি স্কুলের সমপরিমাণ ব্যয় করা অসম্ভব নয়। এতে বছরে অতিরিক্ত ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে, যা অন্যান্য খাতের ব্যয় সংকোচন করে আগামী তিন বছরে সম্ভব। দ্বিতীয় পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পের চেয়ে শিক্ষাকেই এখন মেগা প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। গত অর্থবছরের ৮৭ হাজার কোটি টাকার তুলনায় এটি দেড় গুণের বেশি। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সরকারি প্রত্যয়টি অত্যন্ত ইতিবাচক।
১৮ জুলাই নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শিক্ষা হাব হিসেবে গড়ে তোলার যে স্বপ্নের কথা বলেছেন, তা প্রশংসনীয়। তবে বাস্তবে এটি অর্জন করতে হলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। বর্তমানে আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আস্থা কম, তাই তারা বিদেশে ছুটছেন। জার্মানিতে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ভিসা নিয়ে জটিলতা এর একটি বড় উদাহরণ। জার্মান রাষ্ট্রদূতের তথ্যমতে, ৮০ হাজার শিক্ষার্থীর ভিসার আবেদন জমা পড়ে আছে, অথচ ঢাকা মিশনের সক্ষমতা বছরে মাত্র দুই হাজার। এই ব্যাকলগ পরিষ্কার করতে ৪০ বছর সময় লাগবে। তাই উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী ৩০ বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করে এখনই কাজ শুরু করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কদিন আগে পত্রিকায় একটি সরকারি সিদ্ধান্তের কথা পড়েছিলাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাস্তবায়ন পর্যায়ে অবশ্য এই হিসাব টিকত না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রকৃত ব্যয় ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়াত—এমনটা ধরেই নেওয়া যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ ছাড়া অধ্যয়নরত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পেছনে সরকারের আবর্তক ব্যয়ও অনেক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সবকিছু বিবেচনা করেই হয়তো প্রস্তাবিত এই প্রকল্পে আর অগ্রসর না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ক্যাডেট কলেজে পড়তে পারা একটি বিরাট প্রিভিলেজ, আর আমি তার একজন বেনিফিশিয়ারি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের সব শিশু-কিশোরকে যদি এ রকম বা এর কাছাকাছি সুযোগ দেওয়া যেত, তবে এর চেয়ে কাম্য আর কিছু হতে পারত না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রাথমিক শিক্ষায় ভালো মানের শিক্ষক কেন আসবে।






