আগামী পাঁচ বছরে দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার ও প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে মাথাপিছু গড় আয় ৪ হাজার ৫৯১ মার্কিন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) ‘ট্রান্সফর্মিং ইকোনমি ফ্রম ফ্র্যাজিলিটি টু প্রসপারিটি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। গত বুধবার প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ের জন্য বিভিন্ন অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাথাপিছু গড় আয় ছিল ২ হাজার ৯৫৮ ডলার, যা পাঁচ বছরের পরিকল্পনায় ১ হাজার ৬৩৩ ডলার বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে মাথাপিছু আয় বলতে জাতীয় আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করা গড় হিসাবকে বোঝায়, যা ব্যক্তির একক আয় নয়।
সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে জিইডি আগামী পাঁচ বছরের পরিকল্পনাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছে। প্রথম বছরে পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়া হবে, যেখানে বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ, মূল্যস্ফীতি হ্রাস এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্য রয়েছে। সর্বশেষ পর্যায়ে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ধাপে ধাপে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে তা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে সরকারের।
ব্যাংকিং খাতের সুশাসন ফেরাতে পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম বছরে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাংক ও খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করে আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি সক্ষমতা ও পরিচালনাগত স্বাধীনতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেবে। পরবর্তী বছরগুলোতে আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক ও দক্ষ করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজস্ব খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগকে আলাদা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি একক ভ্যাট হার চালু, করছাড়ের হার কমানো এবং কর প্রদান প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। ছোট ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-লাকসাম-ফেনী কর্ডলাইন নির্মাণ এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত ও বিদ্যুতায়ন অন্যতম। এছাড়া ঢাকা থেকে পঞ্চগড় ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত রেলপথ ডাবল লাইন করা এবং মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বড় শহরগুলোতে মেট্রোরেল, মনোরেল ও কমিউটার রেল চালুর পরিকল্পনাও এই রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে জিইডি। ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর ৫৬০ জন তরুণকে স্টার্টআপ ফান্ড থেকে সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিবছর ১ হাজার ২০০ নারী উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা ও সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল ভিত্তি হিসেবে সুশাসনকে অপরিহার্য বলে মনে করছে জিইডি। সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কার্যকর সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সহজ হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৬–২৭ থেকে ২০৩০–৩১ অর্থবছর পর্যন্ত সময়ের জন্য তৈরি করা প্রতিবেদনটি বুধবার (১৯ আগস্ট) প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রথম থেকে তৃতীয় বছরকে পুনঃস্থাপনের পর্যায় হিসেবে ধরা হয়েছে।






