নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ১৮০ দিনে দেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকট খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), প্রি-স্যুট মধ্যস্থতা, এককালীন ‘স্পেশাল এক্সিট’ সুবিধা এবং আইনি প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার মতো উদ্যোগগুলো উল্লেখযোগ্য। এছাড়া বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের বিষয়েও সরকার সক্রিয় হয়েছে। তবে এতসব উদ্যোগের পরেও ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের চিত্র এখনো স্বস্তিদায়ক নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অথচ গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এই অংক ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। মার্চ মাস শেষে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশই খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ফলে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়নে খেলাপি ঋণের পাহাড় কমার কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৃদ্ধির পেছনে কেবল নতুন করে ঋণখেলাপি হওয়ার বিষয়টিই একমাত্র কারণ নয়। ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ শ্রেণিকরণ পদ্ধতির পরিবর্তনের ফলে পরিসংখ্যানে এই প্রভাব পড়েছে। তাই এক প্রান্তিকের হিসাব দিয়ে সরকারের নেওয়া নীতির চূড়ান্ত ফলাফল বিচার করা কঠিন। তবুও মার্চ পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য ব্যাংক খাতের সংকট নিরসনে বড় ধরনের সাফল্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে এডিআর বা অলটারনেটিভ ডিসপিউট রেজিলিউশন ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন মামলা করার আগে প্রি-স্যুট মধ্যস্থতার মাধ্যমে ঋণগ্রহীতা ও ব্যাংকের মধ্যকার বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। এছাড়া গত জুনে চালু করা ‘স্পেশাল এক্সিট’ সুবিধার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অনাদায়ী ঋণ থেকে ব্যাংকগুলোকে বের করে এনে নগদ অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে। ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ সংক্রান্ত বিশেষ নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে।
ব্যাংকগুলোকে ৩০ জুনের মধ্যে তাদের খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নগদে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। তবে এই পদ্ধতি নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে। সুদ বা অন্যান্য সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের সঙ্গে সমতার বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যবস্থার সাফল্য মূলত নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কত টাকা ব্যাংকের কোষাগারে ফেরত আসে তার ওপর।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার মনে করেন, আইনি জটিলতাই খেলাপি ঋণ আদায়ের প্রধান বাধা। তার মতে, খেলাপি ঋণের প্রায় ৯০ শতাংশই ইচ্ছাকৃত এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া গেলে এর প্রায় ৬০ শতাংশ আদায় করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, অনেক সময় ব্যাংকের মামলা প্রস্তুত করতেই কয়েক মাস সময় লেগে যায়, আবার প্রভাবশালী খেলাপিরা আদালতের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে বা সম্পদ জব্দ ঠেকাতে প্রভাব খাটানোর সুযোগ পায়।
অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদ খেলাপি ঋণের কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন, ঋণের ঝুঁকি পর্যালোচনার দুর্বলতা, সঠিক কাঠামো মেনে ঋণ না দেওয়া, কার্যকর জামানতের অভাব এবং ব্যবসার অভ্যন্তরীণ নগদ প্রবাহ পর্যাপ্ত না থাকাই মূলত ঋণকে খারাপ করে তোলে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক আনুকূল্যে বা ওপরের নির্দেশে ঋণ দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও সরকারঘনিষ্ঠ ব্যাংকগুলোতে। তার মতে, শুধু আইনি লড়াই করে মন্দ ঋণ আদায় সম্ভব নয়; এর সঙ্গে আর্থিক খাতের সংস্কার, সুশাসন এবং নীতি প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি।
পরিশেষে, সরকারের সামনে এখন তিনটি বড় পরীক্ষা রয়েছে। প্রথমত, এডিআরের মাধ্যমে বাস্তবে কত টাকা আদায় সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, ‘স্পেশাল এক্সিট’ সুবিধা থেকে কত অর্থ ব্যাংকে ফিরে আসে। তৃতীয়ত, বড় ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে কত অর্থ পুনরুদ্ধার করা যায়। সব মিলিয়ে, খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার হলেও, তার সুফল এখনো ব্যাংকের হিসাবের খাতায় বড় আকারে প্রতিফলিত হয়নি।




