রাজধানীর বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিন হাজারো পথশিশুর দেখা মেলে। হাতে ফুল কিংবা টুকিটাকি পণ্য নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এসব শিশুর জীবনের গল্পগুলো বেশ করুণ। দারিদ্র্য, পারিবারিক বিপর্যয় এবং বাসস্থানের অভাবে তারা শিক্ষা, চিকিৎসা ও নিরাপদ শৈশব থেকে বঞ্চিত। শুক্রবার (২ অক্টোবর) জাতীয় পথশিশু দিবসের প্রাক্কালে তাদের এই অনিশ্চিত জীবনের চিত্র আরও একবার সামনে এসেছে। বিজয় সরণীতে যানজটে গাড়ি থামলেই শোনা যায়—‘ভাইয়া, একটা ফুল নেন’, ‘আপু, একটা ফুল নেন। ’ হাতে ফুল নিয়ে পথচারী ও গাড়িচালকদের কাছে ঘুরে বেড়ানো এসব শিশুর জীবনের গল্প অবশ্য ফুলের মতোই সুন্দর নয়। বিভিন্ন গবেষণায় পথশিশুদের মাদক ও অপরাধের ঝুঁকিতে থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
ইউনিসেফের ‘সার্ভে অন স্ট্রিট চিলড্রেন ২০২২’ শীর্ষক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছিল, সেই সময় বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা ছিল ১০ লাখের বেশি। তবে ২০২৩ সালে প্রকাশিত ওই জরিপের পর ২০২৪ সালের নতুন তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে পথশিশুর সংখ্যা অন্তত ৩৪ লাখ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকলে তা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা এসব শিশুকে অপরাধী চক্রের প্ররোচনা থেকে রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। জরিপটির ফলাফল ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ, করোনার পর পথশিশুর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এদিকে ক্রমাগত এই শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে দেশের সামাজিক জীবন চরম নির্মমতা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের দিকে চলে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এসব শিশু টিকে থাকার লড়াই কিংবা অপরাধী চক্রের প্ররোচনায় চুরি, ছিনতাই, ভিক্ষাবৃত্তিসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
গবেষক হাসান রেজা জানিয়েছেন, পথশিশুদের জীবন কেবল দারিদ্র্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তারা শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের মতো ভয়াবহ বাস্তবতার সম্মুখীন। বিশেষ করে সদরঘাট ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের মতো এলাকাগুলোতে এসব শিশুকে ময়লা পরিষ্কারের মতো অমানবিক কাজে বাধ্য করা হয়। এছাড়া গ্যাং রেপ বা যৌন হয়রানির মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
পথশিশুদের অধিকার রক্ষায় প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা অন্যতম বাধা। কারিতাস বাংলাদেশের তথ্য বলছে, দেশের পথশিশুদের ৫৮ দশমিক ২ শতাংশের কোনো জন্মসনদ নেই। এমনকি জন্মসনদবিহীন এসব শিশুর ৭১ দশমিক ৪ শতাংশ তাদের পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর পর্যন্ত জানে না। গবেষকদের মতে, জন্মসনদ না থাকা একটি বড় মানবাধিকার সংকট, যা শিশুদের নাগরিক সুবিধা পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। করোনা মহামারির পর তাদের জীবনযাপন ও নিরাপত্তার সংকট আরো প্রকট হয়েছে। দেশের পথশিশুদের সুরক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
এই সংকট নিরসনে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ‘পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন প্রকল্প’ নামে একটি বৃহৎ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ৪২০ কোটি টাকার এই পুরো প্রকল্পের অর্থায়ন আসবে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে। চলতি বছর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কার্যক্রম ২০৩১ সালের জুন মাস পর্যন্ত চলবে।
প্রকল্পের আওতায় দেশের ৩১টি জেলা, ৩৪টি উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন এবং ৮টি পৌরসভাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিবিএসের ২০২২ সালের জরিপের ভিত্তিতে এলাকাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য এলাকাগুলোর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, গাজীপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন অন্যতম।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র (শেল্টার হোম), ৩টি ট্রানজিট হোম এবং ১৫০টি উন্মুক্ত পথশিশু স্কুল পরিচালনা করা হবে। সেখানে ৬ হাজার ৬০০ পথশিশুকে পুনরায় পরিবার ও সমাজে একীভূত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ৫০০ শিশুকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষার আওতায় আনা হবে এবং ১ হাজার ৯০০ শিশুর জন্য আবাসন নিশ্চিত করা হবে। এছাড়াও শিশুদের জন্য ১৫টি কাউন্সেলিং বুথ স্থাপন করা হবে।
প্রকল্পটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো পথশিশুদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা। শেল্টার হোমে থাকা আগ্রহী শিশুদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যারা উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী, তাদের আর্থিক অনুদান বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। বিশেষ করে ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী তরুণদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রয়োজনে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হবে।
ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সহায়তায় ১২৫টি ইউনিয়নে সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালানো হবে। সচেতনতা বৃদ্ধিতে পোস্টার, বিলবোর্ড, পথনাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এছাড়াও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন শিশুদের ফিরিয়ে আনতে একটি বিশেষ নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে ‘পালক পরিবার’ বা ফস্টার ফ্যামিলি ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পথশিশুদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণে একটি বেইসলাইন জরিপ এবং বায়োমেট্রিক ডেটাবেজ তৈরির কাজও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার মাধ্যমে এসব শিশুকে সরকারি সেবার আওতায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টা থাকবে। সবশেষে, বিত্তশালী ব্যক্তি ও বেসরকারি সংগঠনগুলোকে এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে সরকার।





