আইনি সুরক্ষা ও আপিলের সুযোগ না দিয়ে এক নারীকে ‘বিদেশি’ ঘোষণা করে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আসাম সরকারকে দুই লাখ রুপি অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের গুয়াহাটি হাইকোর্ট। গত ৩ সেপ্টেম্বর বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খান্ডের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই যুগান্তকারী আদেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাসনসংক্রান্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে কাউকে সীমান্ত পার করে দেওয়ার ঘটনায় রাষ্ট্রের ওপর ক্ষতিপূরণ আরোপের এটিই প্রথম ঘটনা।
ভুক্তভোগী ওই নারীর নাম মমতাজ বেগম। তাঁর স্বামী মুজাম্মেল হকের করা হেবিয়াস করপাস আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এই নির্দেশ দেন। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, আসামের নগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল গত ৩০ মে মমতাজ বেগমকে বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। ট্রাইব্যুনালের এই কার্যক্রমে ‘আইনি বিদ্বেষ’ প্রকাশ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিচারকেরা। এর আগে হাইকোর্ট মামলাটি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিলেও ট্রাইব্যুনাল মমতাজের জমা দেওয়া সব প্রমাণ আমলে নেয়নি। পুনর্বিবেচনার পর নিজেকে বিদেশি ঘোষণার আদেশ পাওয়ার পরপরই কোনো আইনি প্রতিকারের সুযোগ না দিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মমতাজ বেগমের ক্ষেত্রে ঘোষিত বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কারসংক্রান্ত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউরের (এসওপি) সরাসরি লঙ্ঘন হয়েছে। এসওপি অনুযায়ী, বহিষ্কারের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনি লড়াইয়ের সব সুযোগ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। রাষ্ট্রযন্ত্রই মমতাজ বেগমকে ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যাওয়ার অধিকার প্রয়োগে বাধা দিয়েছে বলে বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করেন।
ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি আদালত ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন, বাংলাদেশে মমতাজ বেগমকে খুঁজে বের করে তাঁকে ভারতে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে। মামলায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে পক্ষভুক্তও করা হয়েছে। আদালত স্পষ্ট করেছেন, এই অন্তর্বর্তীকালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়ানি আদালতে আরও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার ক্ষেত্রে আবেদনকারীর অধিকার খর্ব করবে না; এটি অতিরিক্ত পাওনা হিসেবে গণ্য হবে।
নগাঁওয়ের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন বিচারকেরা। গত ৩০ মে দেওয়া ট্রাইব্যুনালের আদেশটি ঠিক কবে ও কখন প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা তদন্ত করে আসামের স্বরাষ্ট্র ও রাজনৈতিক বিভাগকে জানাতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনাল সদস্যের কম্পিউটার জব্দ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ভবিষ্যতে কোনো ঘোষিত বিদেশি নাগরিককে হেফাজতে নেওয়ার আগে ট্রাইব্যুনালের আদেশ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা এবং জেলা থেকে সরানোর আগে পরিবারের একজন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে জানানোর জন্য জেলা পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সন্দেহভাজন কোনো ব্যক্তি বৈধ নাগরিক, নাকি বিদেশি, তা নির্ধারণ করার জন্য মূলত এই আধা বিচার বিভাগীয় সংস্থা বা ট্রাইব্যুনাল কাজ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ডিভিশন বেঞ্চ উল্লেখ করেছেন, গ্রেপ্তারের সময় ও পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাইব্যুনাল সদস্য ও পুলিশের দেওয়া তথ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিচারকেরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নথিপত্র পর্যালোচনায় ট্রাইব্যুনালের কর্মকাণ্ডে ‘আইনের দৃষ্টিতে বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্যের’ ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা।






