তুরস্কের পূর্বাঞ্চলীয় আগরি প্রদেশের দোগুবায়াজিত এলাকায় ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাগৈতিহাসিক ‘নূহের নৌকা’র সন্ধানে নতুন করে বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। ‘দুরুপিনার ফরমেশন’ নামের নৌকার আকৃতির একটি মাটির ঢিবি বা ভূতাত্ত্বিক গঠনকে কেন্দ্র করে কয়েক দশক ধরে নানা বিতর্ক ও আলোচনা চলছে। এই রহস্য উন্মোচনে এবার গবেষকরা মাটির নিচে আধুনিক অনুসন্ধান, রাডার স্ক্যান, নমুনা সংগ্রহ ও কোর ড্রিলিংয়ের মতো উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা / আদালতে আপসনামা, এমপি গাজী নজরুলের জামিনে আপত্তি নেই মরিয়মের বাবার। ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত: বাণিজ্যমন্ত্রী। ডেঙ্গুতে একদিনে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৯৪৮। তুরস্কে ‘নূহের নৌকা’র খোঁজে পাহাড় খনন, গবেষণায় যা মিলল। হামের উপসর্গে আরও ৪ জনের মৃত্যু, মোট ১১০৮। দুরুপিনার ফরমেশনটির অবস্থান তেলচেকের গ্রামের কাছে, দোগুবায়াজিত জেলায় ও আরারাত পর্বতের কাছাকাছি। এর আগে স্থানীয় পর্যায়ে জরিপ, খনন ও অন্যান্য অনুসন্ধান চালানো হলেও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এই অনুসন্ধানের খবর বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেছে। এটি নিয়ে কাজ করতে ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত তিনটি তথ্যচিত্র নির্মাণকারী দল সেখানে অবস্থান করছে। এর মধ্যে বিশ্বখ্যাত অভিযাত্রী ও টেলিভিশন উপস্থাপক বেয়ার গ্রিলসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি দলও রয়েছে। তুরস্কের ফিল্ম কমিশনের প্রেসিডেন্ট সাইত ইয়ারদিমজি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য দোগুবায়াজিত অঞ্চলটিকে বেছে নেওয়ায় বিশ্ব দরবারে এই এলাকার পরিচিতি আরও বৃদ্ধি পাবে।
তৈলাক্ত বা অন্য কোনো কারণে নয়, বরং প্রাকৃতিক গঠনের বৈচিত্র্য অনুসন্ধানে কাজ করছেন সিভাস জুমহুরিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জানকার আতিলা এবং তার সহযোগী মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স। তারা প্রথমে ওই অঞ্চলের জিপিএস অবস্থানগুলো চিহ্নিত করে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক মানচিত্র এবং অরথোফটো ম্যাপ তৈরি করেছেন। পরে ভূগর্ভস্থ গঠন শনাক্ত করতে বিশেষায়িত রাডার ব্যবহার করা হয়।
গবেষকদের নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক আতিলা জানান, রাডার জরিপে মাটির নিচে কিছু ফাঁপা বা শূন্যস্থান চিহ্নিত করা গেছে, যা দেখতে করিডর বা কক্ষের মতো মনে হয়। এগুলোকে লক্ষ্য করেই বর্তমানে ড্রিলিং এবং মাটির নমুনা সংগ্রহের কাজ চলছে। একই সঙ্গে ‘নোয়াস আর্ক স্ক্যানস’ নামের অভিযানের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট জানায়, সেখানে পাওয়া একটি সম্ভাব্য করিডর ২৫০ ফুটেরও বেশি দীর্ঘ বলে গবেষক দলটি দাবি করেছে।
পরবর্তী ধাপে এই মাটির নিচের সরু ড্রিল করা ছিদ্রে ‘গোফার’ নামের বিশেষায়িত রোবট পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এই রোবটটি মাটির তলদেশ থেকে উচ্চ রেজ্যুলেশনের ভিডিও চিত্র ধারণ করার পাশাপাশি সূক্ষ্ম মাটির নমুনা সংগ্রহ করতে সক্ষম। তবে আনাদোলুর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গবেষণার এই পর্যায়ে এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে এই মাটির ঢিবির ভেতরে নূহের নৌকার কোনো ভগ্নাবশেষ আসলেই বিদ্যমান রয়েছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু ও সরকার নিয়ন্ত্রিত ডেইলি সাবাহ’র প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হলো মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ। ফক্স নিউজের বরাতে মার্কিন গবেষক অ্যান্ড্রু জোন্স জানান, ঢিবির ভেতরের ও বাইরের মাটির রাসায়নিক উপাদানে বিস্তর ফারাক রয়েছে। ভেতরের মাটিতে বাইরের তুলনায় জৈব পদার্থের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ বেশি। এছাড়া ভেতরের মাটিতে পটাশিয়ামের পরিমাণ ৩৮ শতাংশ বেশি এবং পিএইচ মাত্রায় প্রায় আট গুণ পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। জোন্সের মতে, দীর্ঘ সময় কোনো বদ্ধ জায়গায় জৈব পদার্থ পচে যাওয়ার ফলে মাটির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যে এমন পরিবর্তন আসতে পারে, তবে এটিই নৌকার অস্তিত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
দুরুপিনার মাটির ঢিবিটি ১৯৫৯ সালে প্রথম বিশ্ববাসীর নজরে আসে, যখন তুরস্কের সামরিক বাহিনীর ক্যাপ্টেন ও মানচিত্রবিদ ইলহান দুরুপিনার আকাশ থেকে নেওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে এই অদ্ভুত নৌকাসদৃশ গঠনটি শনাক্ত করেন। এরপর থেকে এই স্থানটিকে নূহের নৌকার সম্ভাব্য ধ্বংসাবশেষ হিসেবে ধারণা করা হলেও বিজ্ঞানীদের বড় অংশ একে প্রাকৃতিক ভূতাত্ত্বিক কাঠামো হিসেবেই দেখে আসছেন। ১৯৯৬ সালের এক গবেষণাপত্রেও একে চুনাপাথর ও আগ্নেয় কাদামাটির প্রাকৃতিক মিশ্রণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, যা আবহাওয়ার কারণে নৌকার রূপ নিয়েছে।
এর আগে মার্কিন উদ্ধারকারী বিশেষজ্ঞ ডেভিড ফ্যাসোল্ডও গ্রাউন্ড-পেনিট্রেটিং রাডার দিয়ে এই স্থানটি পরীক্ষা করে দৈর্ঘ্য মেপেছিলেন ১৬৪ মিটার, যা বাইবেলে বর্ণিত নৌকার পরিমাপ ১৫৭ মিটারের খুব কাছাকাছি। এছাড়া আশপাশের বড় পাথরগুলোকে প্রাচীন জাহাজের নোঙর দাবি করা হলেও সংশয়বাদীরা এগুলোকে প্রাচীন সমাধিফলক বলে মনে করেন। পরবর্তীতে ফ্যাসোল্ড নিজেও তার আগের দাবি থেকে সরে আসেন। এছাড়া ২০১৯ সালের একটি ত্রিমাত্রিক রাডার স্ক্যানেও ভূগর্ভে অস্বাভাবিক কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়ার তথ্য জানিয়েছিল ফক্স নিউজ, যা বর্তমান গবেষণায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বর্তমান গবেষণা দলের প্রধান অধ্যাপক আতিলা জানিয়েছেন, সংগৃহীত নমুনাগুলো পুরো শীতকালজুড়ে ল্যাবরেটরিতে নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা হবে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এর চূড়ান্ত ফলাফল জানা যেতে পারে। শীতকালে পার্বত্য অঞ্চলের বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এই প্রকল্প আগামী বছর এবং তার পরের বছরও চালু রাখার পরিকল্পনা রয়েছে বিজ্ঞানীদের।
ঐতিহাসিকভাবে নূহের নৌকা ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নোয়াস আর্ক স্ক্যানসের লরেন উইটজকে জোর দিয়ে বলেছেন, এই ঢিবিটি আসলেই নূহের নৌকার ধ্বংসাবশেষ কি না, তা সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে নির্ধারণ করাই তাদের মূল লক্ষ্য। যদি এটি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে এই অঞ্চলটি পর্যটন ও ধর্মীয় তীর্থস্থান হিসেবে সারা বিশ্বে নতুন ইতিহাস তৈরি করবে।






