জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান স্পষ্ট করেছেন যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন থেকে আর কোনো দেশের অধীন থেকে পরিচালিত হবে না। স্পিকার হাফিজউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও আলোচনা অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে সমানে সমান লড়াইও হবে, তবে দেশের পররাষ্ট্রনীতির ওপর অন্য কারো নিয়ন্ত্রণ আর মেনে নেওয়া হবে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, অন্যের নির্দেশনায় চলার সেই অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রায় ৪০ মিনিটের দীর্ঘ বক্তব্যে শফিকুর রহমান দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সীমান্ত হত্যা, তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানি সংকট, জুলাই গণহত্যার বিচার, সংবিধান সংস্কার এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, ফেলানীর মতো আর কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের লাশ কাঁটাতারে ঝুলতে দেখতে চান না। এছাড়া গঙ্গা পানিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় এর নবায়ন এবং তিস্তা সংকট সমাধানে সরকারকে এখনই কার্যকর ও শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, সৎ মানুষ কখনো পালায় না; যারা অপরাধী, চোর বা লুটেরা, তারাই দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে বসে ভয়ভীতি ছড়াচ্ছে।
সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান ঠেকাতে সংবিধানে কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। তিনি সাধারণ সংশোধনীর পরিবর্তে গণপরিষদ বা সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাব করেন, যাতে ভবিষ্যতে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হওয়ার সুযোগ না থাকে। একই সঙ্গে তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ওই গণভোটে ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে যে গতি ছিল, বর্তমানে তা কমে গেছে, যা শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। তিনি শরীফ ওসমান হাদী হত্যার বিচারসহ জুলাই গণহত্যার বিচার দ্রুত শেষ করার তাগিদ দেন।
সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সরকারি দলের সদস্যদের তুলনায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা কম বরাদ্দ পাচ্ছেন। এমনকি সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও এই বৈষম্য প্রকট। তিনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে আনুপাতিক হারে বরাদ্দ বণ্টনের আহ্বান জানান।
সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত সম্প্রতি পাস হওয়া বিলের বিষয়ে তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ জানান যেন এতে স্বাক্ষর না করা হয়। তার দাবি, এই বিলের বিধান কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বিলটি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিশেষজ্ঞদের কাছে পাঠিয়ে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
দেশের শিল্প ও অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিলে ব্যাংকঋণ ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি ঢাকা-১৫ আসনের সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজের উদাহরণ দেন। তিনি জানান, সেখানে ২৯৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে মাত্র ১০৩ জন কর্মরত আছেন। এই অবহেলিত খাতকে শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানান তিনি। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক দখলদারি, প্রশ্নফাঁস ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধের আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তিনি বলেন, এসব ব্যক্তি ‘আসি আসি’ বলে ক্রমাগত ভয়ভীতি ও অপপ্রচার ছড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শফিকুর রহমান বলেন, ‘যদি বিশ্বাস করেন যে এই দেশকে, জাতিকে ভালোবাসেন—তাহলে মাটি কামড়ে থাকতেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অপরাধ করলে অপরাধের শাস্তি নিতেন, না করলে নিজেকে পরিষ্কার করতেন।’ তিনি বলেন, পালায় কে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে শফিকুর রহমান বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের অবদান অস্বীকার করেন না তাঁরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে কোনো অপরাধী বা খুনিকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া কিংবা সেখান থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বাংলাদেশ আর কারও অধীনে তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে না। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওই চ্যাপটার ক্লোজ, ওইটা আর রি-ওপেন হবে না।’। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিগত ১৬ বছরের গুম, আয়নাঘর ও রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের পর বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।






