গত ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। ৩০০টি আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২১২টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। সরকারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও সংসদীয় কার্যক্রম পরিচালনায় বর্তমান স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বেশ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে দেখা গেছে, সরকারি দলের সদস্যরা প্রায়ই বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের বক্তব্যে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ৯ সেপ্টেম্বর ব্যাংক রেজ্যুলেশন (সংশোধন) বিলের ওপর আলোচনার সময় স্বতন্ত্র সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা যখন বিএনপি সরকারের সমালোচনা করছিলেন, তখন সরকারি দলের এমপিরা হইচই শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাদের শান্ত হতে নির্দেশ দেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, কোনো সদস্যের বক্তব্য পছন্দ না হলেও তাকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিমত থাকলে পরবর্তীতে তা খণ্ডন করার সুযোগ রয়েছে, তবে বক্তব্য দেওয়ার অধিকার খর্ব করা সংসদীয় রীতির পরিপন্থী।
ডেপুটি স্পিকারের মতে, সংসদীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের বক্তব্যের অধিকার নিশ্চিত করা সরকারি দলের হুইপদেরও দায়িত্ব। এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিয়ে আলোচনার সময়ও তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের বক্তব্যের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। প্রধানমন্ত্রী জনসমক্ষে জ্বালানি পরিস্থিতির সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যে সেই আন্তরিকতা বা স্বচ্ছতার অভাব ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশন কক্ষের শৃঙ্খলা ও সংসদীয় বিধি মেনে চলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তিনি অধিবেশন চলাকালে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মোবাইল ফোন ব্যবহার, অপ্রাসঙ্গিক কথা বা সাইড টক এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির মতো বিষয়গুলোতে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও স্পিকারের কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদার ব্যক্তিদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি করার বিষয়টি তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের হাতে সংসদীয় কমিটির নেতৃত্ব থাকলে সরকারের ওপর কার্যকর নজরদারি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে তিনি চিফ হুইপকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়েছেন।
মন্ত্রীদের সংসদীয় আচরণের ক্ষেত্রেও স্পিকারের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ কয়েকজন মন্ত্রীর কটাক্ষমূলক বা বিদ্রুপপূর্ণ বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন তিনি। স্পিকারের মতে, বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিতে হবে তথ্য ও যুক্তির মাধ্যমে। বিদ্রুপের আশ্রয় নিলে সংসদীয় বিতর্কের মান ও পরিবেশ নষ্ট হয়।
সংসদ সচিবালয়ের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক কামরুল ইসলামের মতে, একটি কার্যকর সংসদের মূল ভিত্তি হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের আইন পাসের সক্ষমতার পাশাপাশি বিরোধী দলের প্রশ্ন ও বিকল্প প্রস্তাবের গুরুত্ব দেওয়া। কোনো বক্তব্য অসংসদীয় হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু কণ্ঠরোধ সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়।
তৃতীয় অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের এসব নির্দেশনা সংসদীয় অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী ও স্বতন্ত্র সদস্যদের মত প্রকাশের সুযোগ প্রদান এবং সরকারি দলের সদস্যদের শৃঙ্খলার মধ্যে ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আগ্রহ। সংসদীয় রুলিং বা নির্দেশনাসমূহ ভবিষ্যতে সংসদীয় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই দেখার বিষয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারা সরকারি দলের সদস্যদেরও বিরোধী দলের মতো স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় তাদের দুজনের অবস্থানই স্পষ্ট হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একপর্যায়ে সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পরও তাদের প্রতিবাদ চলতে থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু বক্তব্য দেওয়ার সুযোগই বন্ধ করে দেওয়া সংসদীয় রীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এ সময় চিফ হুইপের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।






