প্রবাসে অমানবিক নির্যাতন ও লাঞ্ছনার খবর প্রায় নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও পরিস্থিতির পরিবর্তন নেই, বরং ঝুঁকি নিয়ে বিদেশযাত্রার প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব দেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় দ্বিপাক্ষিক চুক্তি বা আইনি কাঠামো নেই, সেসব দেশেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে নারীরা পাড়ি জমাচ্ছেন। দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই সেখানে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত ছয় মাসে প্রায় ২৬ হাজার নারী শ্রমিক ৪৭টি দেশে কাজের সন্ধানে গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গেছেন সৌদি আরবে (১৭ হাজারের বেশি), জর্ডানে (সাড়ের ৬ হাজারের বেশি), কাতারে (৬০০ জন), সংযুক্ত আরব আমিরাতে (২৫০-এর বেশি), জাপানে (১৫৫ জন) এবং ইতালিতে (১৫০ জন)। এছাড়া সিঙ্গাপুরে ৭৭ জন, সাইপ্রাসে ৭৬ জন, মরিশাসে ৩৯ জন, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৭ জন, গ্রিসে ৩৫ জন, পর্তুগালে ৩২ জন, লাওস ও মাল্টায় ২০ জন করে, ইরাক ও লেবাননে ১৩ জন করে এবং মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া ও কেনিয়ায় ১০ জন করে নারী গিয়েছেন। এর বাইরে যুক্তরাজ্য ও ম্যাকাওয়ে ৯ জন, ভিয়েতনাম ও রাশিয়ায় ৮ জন, সার্বিয়া ও মঙ্গোলিয়ায় ৭ জন, মলদোভা, ফিজি, চীন ও কুয়েতে ৫ জন করে, ব্রুনাই ও মালয়েশিয়ায় ৪ জন করে, স্লোভেনিয়া, বেলারুশ, সেশেলস ও বুলগেরিয়ায় ৩ জন করে, পোল্যান্ড, ব্রাজিল ও ওমানে ২ জন করে এবং অস্ট্রেলিয়া, আয়ারল্যান্ড, কম্বোডিয়া, টোঙ্গা, বাহামাস ও নিউজিল্যান্ডে অন্তত ১ জন করে নারী শ্রমিক কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছেন।
তুলনামূলক পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত বছরের একই সময়ে নারী অভিবাসীর সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৯৩৬ জন। তখন ৫০টি দেশে নারী শ্রমিকেরা কাজের জন্য গিয়েছিলেন, যার মধ্যে সৌদি আরবে ১৬ হাজার ৬৩২ জন, জর্ডানে ৪ হাজার ৬৯৪ জন, কাতারে ১ হাজার ৪৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪৪৭ জন এবং কুয়েতে ১৭৪ জন গমন করেছিলেন।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী এই পরিস্থিতির তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, অপ্রচলিত ও চুক্তিহীন বাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য যাচাই ও আইনি কাঠামোর চরম ঘাটতি রয়েছে। সৌদি আরব, জর্ডান এবং হংকংয়ের মতো দেশগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকায় সেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু রাশিয়া, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, টোঙ্গা বা বাহামাসের মতো দেশগুলোতে পাঠানোর বিষয়টি সাধারণ বাণিজ্য নয়। এসব দেশে নারী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে বহির্গমন ছাড়পত্র বা নথিপত্র কীভাবে অনুমোদন করা হচ্ছে, তা মোটেও স্পষ্ট নয়।
বায়রা মহাসচিব আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি উদ্যোগ বা ফড়িয়ার প্রভাবে এসব অনিয়ন্ত্রিত পথে কর্মী পাঠানোর ঘটনা ঘটছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ বা যেখানে নিজস্ব শ্রম উদ্বৃত্ত রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশি নারীদের কাজের দক্ষতা বা ভাষাগত যোগ্যতা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তিনি অনানুষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত শ্রমবাজার বন্ধ করতে সরকারের কঠোর নীতিমালা এবং নিবিড় তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
এদিকে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের বিদেশ নিয়ে পাচার বা অনৈতিক কাজে ব্যবহারের একটি ভয়ংকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে যেখানে পুরুষ শ্রমিক নেই, অথচ নারী শ্রমিক পাঠানো হচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি। এছাড়া প্রেমের ফাঁদ বা বিয়ের প্রলোভনে বিদেশ পাঠানোর মতো ঘটনাগুলোর ব্যাপারেও পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তারপরও থেমে নেই নারীদের অনিরাপদ বিদেশযাত্রা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দালালদের ফাঁদে পড়ে সব হারাচ্ছেন অনেকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিদেশ যাওয়া এসব নারীদের মধ্যে বড় একটি অংশ বাংলাদেশ থেকে অপ্রচলিত ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, ভাষাশিক্ষা ছাড়া বিদেশ যাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বায়রা মহাসচিব বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রচলিত বাজারগুলোতে বর্তমানে পুরুষ শ্রমিকের চাহিদা কমলেও নারী গৃহকর্মীদের একটি অংশ দুবাই, ওমান ও সৌদি আরবে কাজ পাচ্ছেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব দেশে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যোগাযোগের দক্ষতা বা ভাষার প্রশিক্ষণ তাদের আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা উচিত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অন্য অপ্রচলিত দেশগুলোতে কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের ফাঁদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এমনকি প্রেমের কিংবা বিয়ের ফাঁদে ফেলে বিদেশ নেওয়ার মতো বিষয়গুলোতেও আমাদের বাড়তি সচেতনতা ও সতর্কতা বজায় রাখা জরুরি।






