করণ জোহরের জনপ্রিয় টক শো ‘কফি উইথ করণ’-এর নবম মৌসুমে একসঙ্গে হাজির হওয়ার পর অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা ও অভিনেতা বিজয় দেবেরাকোন্ডার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিশেষ করে বিয়ের প্রস্তাব কে প্রথম দিয়েছিলেন এবং বিষয়টি নিয়ে তাঁদের কথোপকথনের ধরন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আপত্তিকর মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ২৬ অক্টোবর দীর্ঘ একটি বার্তার মাধ্যমে পুরো বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন রাশমিকা। তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, একসঙ্গে বয়স বাড়বে, গড়ে উঠবে ভবিষ্যৎ।
টক শোতে কথোপকথনের সময় রাশমিকা জানিয়েছিলেন যে, বিমানবন্দরে বসে তিনিই প্রথম বিজয়কে বিয়ের কথা বলেছিলেন।
বিজয়ের ভাষ্যমতে, সেই সময় তিনি মজা করে রাশমিকাকে বলেছিলেন যে, তাঁকে রাজি করাতে হলে অন্তত ১০০ বার বিয়ের প্রস্তাব দিতে হবে। এই সূত্র ধরে প্রায় এক বছর ধরে রাশমিকা বিয়ের কথা তুলেছিলেন বলে তাঁরা জানান। এই তথ্য প্রকাশের পরপরই নেটিজেনদের একাংশ বিজয়কে নিয়ে সমালোচনা শুরু করেন। তাঁদের দাবি, বিজয় জনসমক্ষে রাশমিকাকে ছোট করার চেষ্টা করেছেন এবং অভিনেত্রীকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তিনি বিয়ের জন্য বেশি আগ্রহী ছিলেন।
অনেকে বিজয়ের এই মন্তব্যকে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের লক্ষণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে রাশমিকা তাঁর ইনস্টাগ্রাম পোস্টে এসব সমালোচনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে থাকা গভীর আবেগ বা ভালোবাসাকে সংখ্যার হিসাবে বিচার করা বোকামি। সম্পর্কের ক্ষেত্রে আংটি বিনিময় বা হাঁটু গেড়ে বসার মতো আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে একে অপরকে বুঝে নেওয়ার বিষয়টিই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। সম্পর্কের ক্ষেত্রে অসম্মানজনক আচরণ বা নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা বোঝাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শব্দটি বহুল ব্যবহৃত হয়। রাশমিকার ব্যাখ্যা, ‘বিষয়টা সংখ্যার নয়’ ২৬ অক্টোবর নিজের ইনস্টাগ্রাম পোস্টে রাশমিকা জানান, সাক্ষাৎকারের মূল বক্তব্য উপেক্ষা করে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে বিয়ের কথা কতবার বলা হয়েছিল কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে কতটা সময় লেগেছিল। জীবনের সুখ-দুঃখ, চাপ ও পরিবর্তনের মধ্যেও তাঁরা একসঙ্গে থাকতে চান কি না, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বিজয় ভবিষ্যতের বাস্তব দিকগুলো ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর বক্তব্য, স্বামীকে গভীরভাবে ভালোবাসার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু নেই। ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি কাজের মধ্যেও সেই আনন্দের প্রতিফলন ঘটছে।
বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচকদের উদ্দেশে রাশমিকা সরাসরি প্রশ্ন রাখেন, “আমার স্বামীকে ভালোবাসি, তাতে সমস্যা কোথায়?” তিনি আরও বলেন, জীবনসঙ্গী হিসেবে এমন একজনকে প্রয়োজন যিনি জীবনের সাধারণ ও অসাধারণ সব মুহূর্তের সঙ্গী হবেন। রাশমিকার মতে, যে মানুষটিকে তিনি বিয়ে করছেন, তাঁকে গভীর ভালোবাসা দেওয়াটাই স্বাভাবিক। বরং এই সিদ্ধান্ত তাঁকে পুনরায় নিতে হলেও তিনি হাজারবার নিতে রাজি আছেন।
নারীবাদ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়েও কথা বলেছেন এই অভিনেত্রী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে তাকে বিজয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার পরামর্শ দিয়ে ভিডিও পোস্ট করছেন। এর জবাবে রাশমিকা জানান, যখন তিনি জীবনের কঠিন সময় পার করছিলেন, তখন বিজয়ের সমর্থনই ছিল তাঁর মূল শক্তি। তিনি অভিযোগ করেন যে, না জেনে কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য করা এবং নারীবাদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে হয়রানি করা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, নারীবাদের আসল অর্থ কাউকে ছোট করা নয়, বরং নিজের জীবন ও সঙ্গী বেছে নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করা। আবার অনেকে মনে করছেন, দুজনের ব্যক্তিগত কথোপকথনকে অযথা বিতর্কে পরিণত করা হচ্ছে।
এদিকে স্ত্রী রাশমিকার পাশে দাঁড়িয়ে বিজয় দেবেরাকোন্ডাও কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ২৬ অক্টোবর নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে রাশমিকার সঙ্গে ছবি পোস্ট করে তিনি জানান, অভিনেত্রী তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু ও স্ত্রী। সমালোচকদের উদ্দেশ্যে বিজয় স্পষ্ট করেন, সারা বিশ্বের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে হলেও তিনি রাশমিকার পাশে থাকবেন। তিনি জানান, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সুখ নিয়ে বাইরের মানুষের অনুমান তাঁদের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না। রাশমিকার মতে, যেসব পরিচালকের সঙ্গে তিনি কাজ করেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর পছন্দকে সম্মান করেন।
পর্দায় নারীর উপস্থাপন ও অভিনয়শিল্পীর পেশাগত সীমারেখা নিয়েও এই তারকাদ্বয় নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। রাশমিকা জানান, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে চরিত্রের প্রয়োজনে খোলামেলা পোশাক বা দৃশ্যে অভিনয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু একজন শিল্পী হিসেবে নিজের স্বাচ্ছন্দ্য ও সীমারেখা বজায় রাখার পূর্ণ অধিকার থাকা উচিত। চুক্তি সম্পাদনের পর এসব বিষয়ে আপত্তি জানানো সহজ না হলেও, ব্যক্তিগত জীবনের সিদ্ধান্ত যে অন্যের হাতে নেই—সেটিই তিনি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
মূলত একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের ছোট অংশকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের জন্ম হয়েছে, তা এখন তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিচারপ্রক্রিয়া এবং নারী-পুরুষের সম্পর্কের সমীকরণে রূপ নিয়েছে। রাশমিকা ও বিজয় দুজনই বাইরের মানুষের অনুমানকে অগ্রাহ্য করে একে অপরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো বিভিন্ন মতামতের উত্তরে রাশমিকা লিখেছেন, যারা আজ তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে মতামত দিচ্ছেন, তাঁরা কেউই বিপদের দিনে পাশে ছিলেন না। বিজয় দেবেরাকোন্ডাও তাঁদের ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের আশ্বস্ত করে বলেছেন যে, তাঁরা একে অপরের সঙ্গে অত্যন্ত সুখী জীবন যাপন করছেন। সব মিলিয়ে এই বিতর্ক এখন নিছক বিনোদনের গণ্ডি পেরিয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। বিজয় লেখেন, ‘যাঁরা আমাদের নিয়ে চিন্তিত, তাঁদের জানাই, আমরা দুজনই ভীষণ সুখী।’।
এই আলোচনার মাধ্যমে উঠে এসেছে যে, তারকাদের ব্যক্তিগত কথোপকথন যখন জনসমক্ষে আসে, তখন তা কীভাবে বিকৃত বা ভুল ব্যাখ্যার শিকার হতে পারে। রাশমিকা ও বিজয়ের এই অবস্থান তাঁদের সম্পর্কের দৃঢ়তাকে যেমন সামনে নিয়ে এসেছে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিতদের বিচার করার প্রবণতার বিরুদ্ধেও একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। অন্য কারও কাছে প্রেমের প্রকাশ একরকম হতে পারে, তাঁদের কাছে তা অন্য রকম।
শেষ পর্যন্ত অভিনেত্রী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, বিয়ের সিদ্ধান্ত তাঁদের পারস্পরিক সম্মতির ফসল এবং বাইরের জগতের মানুষের কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন তিনি বোধ করেন না। বিজয় ও রাশমিকা উভয়ই তাঁদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুখী ও মানসিকভাবে দৃঢ় বলে নিজেদের অবস্থানে অটল রয়েছেন। অভিনেত্রী জানান, শারীরিক অসুস্থতা, ব্যথা কিংবা উদ্বেগের মুহূর্তে বিজয় তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি নিজে শরীরের অতিরিক্ত প্রদর্শনে স্বচ্ছন্দ নন এবং কোন ধরনের পোশাকে তিনি স্বস্তি বোধ করেন, তা পরিচালকদের জানিয়ে দেন। ইন্ডিয়া টুডে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে।






