দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। মঙ্গলবার চট্টগ্রামের জিইসি মোড়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক সাথী ও সদস্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে একজন প্রতিমন্ত্রীকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অস্ত্র হাতে বের হতে হচ্ছে। তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এলাকা কক্সবাজারে একদিনে ৫০টি ট্রাকে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এই অবস্থাকে তিনি দেশের প্রকৃত চিত্র হিসেবে উল্লেখ করেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পরে দেখা গেল তাদের তৈরি করা তালিকায় শিবিরের সাথী ও সদস্যের নামও রয়েছে। কিন্তু চারদিক থেকে মৌচাকে ঢিল মারা হচ্ছে।
ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, সরকারি দলের এমপিরা প্রকাশ্যে স্বীকার করছেন যে তারা দলের কাছে নয়, বরং আওয়ামী লীগের কাছে কৃতজ্ঞ, যারা তাদের নির্বাচনে বিজয়ী করেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে সরকারের কোনো নজর নেই। তারা বিরোধী দলকে নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত। সরকারের উচিত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে মনোযোগী হওয়া। তারা আমাদের নির্বাচনে জয়ী করে দিয়েছেন। আমাদের কোনো কাঁচা কথার জবাব দেওয়ার সময় নেই। একজনকে আল্লাহ রেখে দিয়েছেন সত্যের সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। তার সব মামলা মিথ্যা বলে তাকে খালাস দিয়েছেন আদালত। সর্বোচ্চ জায়গা থেকেও কাঁচা কথাবার্তা আসছে।
তিনি বলেন, মানুষ এখন সব বোঝে এবং জাতির কাছে স্পষ্ট কারা জুলাই বিপ্লবের সাথে গাদ্দারি করেছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি নেতাদের দেওয়া হুমকি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, দলীয় প্রার্থীকে জেতানো না হলে বরাদ্দ না দেওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তা সাংবাদিক সমাজ কীভাবে দেখছে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। জাতি এমন রাজনৈতিক প্রহসন আর দেখতে চায় না বলে তিনি মন্তব্য করেন। জাতি জানে কে জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে আর কে করেনি।’। আজ এই প্রশ্ন আমি সাংবাদিকদের করলাম। তিনি আরো বলেন, ‘জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। আর আমরা একবারও জুলাইয়ের ক্রেডিট নিইনি।
জুলাই বিপ্লব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পরিবর্তনের যে ঝলক এসেছিল, তার স্বীকৃতি এখনো সমাজ পুরোপুরি পায়নি। এছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় বিএনপির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি দাবি করেন, তারা আন্দোলনের সাথে সম্পর্ক অস্বীকার করেছিল এবং শহীদের সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছিল। নিজেদের তালিকা নিয়ে ওঠা বিতর্ক ও জামায়াতের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। জামায়াতকে নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বেহেশতের টিকিট বিক্রির অভিযোগ অমূলক; তারা বরং মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘দেশে ৫৪ বছর ধরে পরিবর্তনের যে আন্দোলন, তার একটা হালকা ঝলক ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এসেছিল। জুলাইয়ের পরে তারা একবার বলেছিল তাদের দলীয় শহীদের সংখ্যা ৪২২ জন, আরেকবার বলেছিল ৮১৭ জন। আমরা বলব, বেহেশতের টিকিট নয়, আমরা নিজেরা বেহেশতের রাস্তা চেনার চেষ্টা করি এবং সেই রাস্তা জনগণকে দেখাচ্ছি।
গত ১৭ বছরের রাজনৈতিক নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূতভাবে জামায়াতের ১২ জন নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এটিএম আজহারের খালাসের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, অন্যরা ন্যায়বিচার পেলে সেদিনের রায় ভিন্ন হতে পারত। ছাত্র-জনতা চাঁদাবাজ বা লুটেরাদের জন্য রক্ত দেয়নি উল্লেখ করে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, আগামী দিনে প্রতিটি অন্যায় ও অধিকার হরণের জবাবদিহি করতে হবে। ১৭ বছর ধরে জামায়াতের ওপর চলা আওয়ামী নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের ১২ জন নেতাকে বিচারবহির্ভূতভাবে ফাঁসির কাষ্ঠে নেওয়া হয়েছে। ১১ জনকে বিনাদোষে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। অন্য ১১ জন ন্যায়বিচার পেলে সেদিনই সেই রায় আসত।’।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম। এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, মুহাম্মদ শাহজাহান, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির ও সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল, উত্তরের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন এবং চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী।
এছাড়া সভায় বক্তব্য রাখেন ডাকসুর জিএস এস. এম. ফরহাদ হোসেন, চাকসু ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রণি এবং ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরীর নেতৃবৃন্দ। এর আগে সকালে বিরোধীদলীয় নেতা হযরত শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে চকবাজারের একটি সমাবেশে যোগ দেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি নুরুল আমিন ও স্থানীয় শিবির নেতারা। সেখান থেকে তিনি নগরের চকবাজারে সাফা অর্কিডে উত্তর জেলা জামায়াত আয়োজিত ইউনিয়ন দায়িত্বশীল সমাবেশে যোগ দেন।






