ফকির লালন শাহের তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় শুরু হয়েছে তিন দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজন। শনিবার বিকেল থেকে আখড়াবাড়ির আঙিনায় সাধু, ফকির ও ভক্তদের সমাগমে এক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা। ১৮৯০ সালের ১ কার্তিক এখানেই দেহত্যাগ করেছিলেন মরমী এই সাধক। তাঁর স্মরণে ও দর্শনের প্রচারের লক্ষ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও সাধুসঙ্গ, আলোচনা সভা এবং গানের আসরের আয়োজন করা হয়েছে। ১৮৯০ সালের ১ কার্তিক কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া গ্রামে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। কেউ উচ্চ স্বরে বলছেন, ‘জয় লালন, জয় লালন’।
আখড়াবাড়ির সামনে জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ৭১ বছর বয়সী আবু বক্করের চোখেমুখে দেখা গেল গভীর তৃপ্তি। ভেড়ামারার ফকিরাবাদ গ্রামের এই বাসিন্দা প্রায় ৫০ বছর ধরে লালন ধামে নিয়মিত আসেন। তাঁর গুরু ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সোলেমান শাহ, যিনি জীবিত থাকাকালে নৌকায় করে লালনের আখড়ায় আসতেন। আবু বক্করের ভাষায়, ছেঁউড়িয়ায় না এলে যেন মন কোথাও স্থির থাকে না। তাঁর মতো শত শত সাধু-ভক্ত এখন একতারা ও ডুগির তালে ‘জয় লালন’ ধ্বনিতে মুখর করে রেখেছেন পুরো চত্বর। গুরুর পথ ধরে আবু বক্করও পাঁচ দশক ধরে এখানে আসছেন। ‘এখানে না এলে মন বাড়িতে টেকে না’, বললেন আবু বক্কর। সাধু-ফকিররা এখানে অষ্টপ্রহর সাধুসঙ্গে কাটাবেন, করবেন আত্মজিজ্ঞাসা, গানে গানে স্মরণ করবেন লালন সাঁইকে।
আয়োজকদের সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার থেকেই সাধু-ভক্তরা আখড়াবাড়িতে আসতে শুরু করেছেন। তাঁদের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী চলছে গুরুকার্য। রাখালসেবা, অধিবাস ও বাল্যসেবার মতো আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোববার দুপুরে পুনঃ সেবার মাধ্যমে এই সাধুসঙ্গ সম্পন্ন হবে। আখড়াবাড়ির ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সাধকদের আত্মজিজ্ঞাসা ও গুরুর স্মরণে মগ্ন হওয়ার দৃশ্য। ভক্তদের কাছে এই আয়োজন কেবল উৎসব নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক চর্চার পবিত্র সময়। সময় বদলেছে, আয়োজনের পরিসর বেড়েছে, কিন্তু আখড়াবাড়িতে আসার আকর্ষণ তাঁর কাছে ফুরায়নি।
কালীগঙ্গা নদীর পাড়ে প্রশাসনের আয়োজনে আয়োজিত মূল মঞ্চের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, লালন ফকিরের জীবনদর্শন কেবল দেশে নয়, সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। স্কুল-কলেজে তাঁর মরমি চিন্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জায়েদ উর রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে চলমান অস্থিরতা নিরসনে লালনের মানবতাবাদী দর্শন অত্যন্ত জরুরি। তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান। স্বাগত বক্তব্য দেন লালন সাধক ফকির হৃদয় শাহ ও ফকিরানী আসমা খানম। আসমা খানম তাঁর বক্তব্যে মানুষের প্রতি ভালোবাসার ওপর জোর দিয়ে বলেন, মানুষের চেয়ে বড় কোনো ধর্ম নেই। অনুষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন ও পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। মূল আলোচক অধ্যাপক রশিদুন নবী লালনের দর্শন ও গান দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়ার দাবি জানান। আসমা খানম বলেন, মানুষই সব, মানুষকে ভালোবাসতে হবে। একতারার টুংটাং শব্দের সঙ্গে কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে প্রবীণেরা গাইছেন লালনের গান।
আলোচনা সভা শেষে প্রবীণ সাধুরা ‘তোমার মতো দয়াল বন্ধু আর পাবো না’ পরিবেশন করে রাতভর গানের আসরের সূচনা করেন। এ সময় ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ বা ‘সময় গেলে সাধন হবে না’-র মতো জনপ্রিয় পদগুলো গাইতে দেখা যায় ভক্তদের। আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে আজ সন্ধ্যায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আবদুল্লাহ হারুন এবং লেখক ফরহাদ মজহার আলোচনা সভায় অংশ নেবেন।
আখড়াবাড়ির অদূরে কালীগঙ্গা নদীর পাড়ের মাঠে জমে উঠেছে লোকজ মেলা। অস্থায়ী দোকানগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। লালনের মানবতাবাদী চিন্তা, মানুষের প্রতি মমতা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের বার্তা নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। সাধুসঙ্গ, গান ও মেলার সম্মিলনে ছেঁউড়িয়া এখন এক বৃহত্তর সাংস্কৃতিক মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিভেদ ভুলে মানুষ কেবল মানুষের কথা বলছে।






