প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় অর্থাৎ ১০৪ বছর পর আবারও যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস নিয়ে গঠিত গ্রেট ব্রিটেন এবং আয়ারল্যান্ড দ্বীপের একাংশ নিয়ে গঠিত এই রাজনৈতিক জোট বা যুক্তরাজ্য এখন অভ্যন্তরীণ ভাঙনের সুর শুনতে পাচ্ছে। সম্প্রতি স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের আঞ্চলিক সরকারপ্রধান বা ফার্স্ট মিনিস্টাররা একজোট হয়ে নিজ নিজ অঞ্চলের স্বাধীনতার দাবি জোরালো করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে। সেখানে এই তিন অঞ্চলের মুখ্যমন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী নেতারা একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক সই করেন। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো নিজ নিজ অঞ্চলের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য—লন্ডনভিত্তিক ব্রিটিশ সরকারের খবরদারি বা আধিপত্য তারা আর মানতে রাজি নন। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করতে চান এবং প্রয়োজনে এর জন্য সাংবিধানিক পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন। তারা বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নামকে এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সহজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য যে, এই সমঝোতা স্মারকে সই করেছেন স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন রামসে সুইনিসহ অন্য নেতারা। তারা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে এই পদক্ষেপে অংশ নিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাজ্য সরকারের ওপর এই জাতীয়তাবাদী নেতাদের চাপ দেশটির বহুদিনের ঐক্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের এই অস্থিরতার পেছনে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট ইস্যুকে অন্যতম বড় প্রভাবক হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণ ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, যা ব্রেক্সিটের সময় উপেক্ষা করা হয়েছিল। এছাড়া ইংল্যান্ডের সম্পদশালী অবস্থান এবং ইংলিশ জাতীয়তাবাদী নেতাদের অনেক ক্ষেত্রে বিমাতাসুলভ আচরণের অভিযোগ তুলে অন্যান্য অঞ্চলের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড একত্রীকরণের প্রতি পরোক্ষ সমর্থনও এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে অনেকে মনে করছেন।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রেট ব্রিটেন দ্বীপের ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতেই ‘ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮০১ সালে আয়ারল্যান্ড দ্বীপ আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের সাথে যোগ দেয়। পরবর্তীতে ১৯২২ সালে আয়ারল্যান্ড দ্বীপের বড় অংশ আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলে যুক্তরাজ্য তার বর্তমান রূপ পায়। সেই ১৯২২ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত যুক্তরাজ্য একটি অভিন্ন রাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয়তাবাদের ঢেউ পরিস্থিতি বদলে দিচ্ছে।
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে ৮৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে ৫৫ দশমিক ৩০ শতাংশ মানুষ স্বাধীনতার বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। তবে বর্তমানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে স্কটল্যান্ডের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জন রামসে সুইনি দাবি করেছেন, ২০১৪ সালের চেয়ে এখনকার পরিস্থিতি ভিন্ন। তার মতে, স্কটল্যান্ডের মানুষ এখন প্রস্তুত এবং যুক্তরাজ্য সরকারের উচিত তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী, ওয়েলসের ‘প্লাইড কাম্রি’ দল ও অন্যান্য জাতীয়তাবাদী দলগুলো এখন নিয়মিতভাবে স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করছে। তাদের ভাষ্যমতে, গণতন্ত্রের পথে বাধা দেওয়ার অধিকার ব্রিটিশ সরকারের নেই। যদিও যুক্তরাজ্য সরকার মনে করে যে, এ ধরনের গণভোট বা বড় কোনো সিদ্ধান্ত ‘এক প্রজন্মে’ একবারই নেওয়া সম্ভব। কিন্তু স্বাধীনতাকামী নেতারা সেই যুক্তি মানতে নারাজ।
ব্রিটানিকার তথ্য অনুযায়ী, অনেক সময় যুক্তরাজ্য ও গ্রেট ব্রিটেনকে সমার্থক মনে করা হলেও ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ১৩০১ সালে রাজা প্রথম এডওয়ার্ডের ওয়েলস জয়ের পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে এই ভূখণ্ডগুলো একত্রিত হয়েছে। ১৭০৭ সালের চুক্তিতে ইংল্যান্ড ও স্কটল্যান্ড একীভূত হয়। বর্তমানে এই দেশগুলোর পার্লামেন্ট ও অ্যাসেম্বলিগুলোতে স্বাধীনতাকামী দলগুলোর প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শতাব্দী প্রাচীন ভিত্তিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এখন দেখার বিষয়, ব্রিটিশ সরকার এই রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক চাপের মোকাবিলায় কী কৌশল গ্রহণ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটি উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ও ইউরোপের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে মহাদেশটির মূল ভূখণ্ড ঘেঁষা সবচেয়ে বড় দ্বীপ। ‘গ্রেট ব্রিটেন’ দ্বীপটির ভৌগোলিক নাম। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই এক দ্বীপেই ৩ ‘দেশ’—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গ্রেট ব্রিটেনের পাশে আরও একটি বড় দ্বীপ আছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই দুই বড় দ্বীপের আশেপাশে আছে অসংখ্য মাঝারি ও ছোট দ্বীপ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: শত শত বছর ধরে এক দ্বীপে বসবাস করলেও তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: খ্রিষ্টধর্মের প্রসার বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে, কমছে যুক্তরাজ্যে—বিশ্ব রাজনীতিতে কী প্রভাব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই দ্বীপের ভেতরে থাকা এই ৩ ‘দেশ’ তথা—ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘ইউনাইটেড কিংডম অব গ্রেট ব্রিটেন’, সংক্ষেপে ‘ইউকে’ বা ‘যুক্তরাজ্য’।






