
দেশের বস্ত্র খাতের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৫০ সালের মধ্যে বার্ষিক তুলার উৎপাদন ১৯ লাখ বেলে উন্নীত করার। বর্তমানে দেশে বার্ষিক প্রায় ১৬ লাখ বেল তুলার চাহিদা রয়েছে, যার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন দিয়ে মেটানো সম্ভব হচ্ছে মাত্র ১৮ থেকে ২০ শতাংশ চাহিদা। বস্ত্রশিল্পের বিশাল চাহিদার বিপরীতে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবসায়িক চাহিদার মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ পূরণ করতে পারছে। প্রতিবছর এই শিল্পে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ বেল তুলার প্রয়োজন হয়, যেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশ থেকে ৭৩ লাখ বেল কাঁচা তুলা ও সুতা আমদানিতে সরকারকে ৮০ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৬.৫১ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে।
তুলা উন্নয়ন বোর্ডের (সিডিবি) নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন জানিয়েছেন, দেশের ৫০টিরও বেশি জেলায় তুলা উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ লাখ বেল, ২০৪০ সালের মধ্যে ১০ লাখ বেল এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ১৯ লাখ বেল আঁশতুলা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে তুলা চাষের আওতাধীন জমি দুই লাখ হেক্টরে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, বরিশাল, ভোলা, বরগুনা, চট্টগ্রাম, ফেনী, কক্সবাজার ও নীলফামারী জেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণ করা হবে।
বর্তমানে দেশের ৩৯টি জেলা ও ১৩২টি উপজেলায় তুলা চাষ হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে উফশী ও পাহাড়ি জাতের তুলা চাষের মাধ্যমে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার বেল আঁশতুলা পাওয়া যাচ্ছে, যার ৬৯ শতাংশ উফশী এবং ৩১ শতাংশ পাহাড়ি জাতের। সরকারি এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে চরাঞ্চল, বরেন্দ্র এলাকা, পাহাড়ি জমি, কম উর্বর জমি, লবণাক্ততা ও খরাপ্রবণ এলাকা এবং আন্তঃফসল হিসেবে তুলা চাষ বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভায় বিষয়টি পর্যালোচনা করে বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও আমদানি ব্যয় কমাতে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এদিকে, গত ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতবিনিময় সভায় দেশের তুলা উৎপাদনের সব সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দিতে সিডিবিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, গত ১৬ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম সভায়ও স্থানীয় তুলা উৎপাদন বাড়ানো এবং বিপুল আমদানি ব্যয় কমাতে সিডিবিকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
স্বাধীনতার পরপরই তুলা চাষ প্রসারে সিডিবি গঠিত হয় এবং ১৯৭৬ সালে রংপুর অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে ডেল্টাপাইন-১৬ জাতের তুলা চাষ শুরু হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে বীজ আমদানির মাধ্যমে গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়। ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর যশোরের চৌগাছায় প্রথম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন খামারের আধুনিকায়নের পাশাপাশি ১৯৯৪ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে তুলা খামার উদ্বোধন করা হয়। বর্তমানে এসব কেন্দ্রকে আধুনিক গবেষণা ও বীজ উৎপাদন ইনস্টিটিউটে রূপান্তরের কাজ চলছে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের ২০ নভেম্বর যশোরের চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুরে ‘কটন রিসার্চ সেন্টার অ্যান্ড সিড প্রোডাকশন ফার্ম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সিডিবির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খামারের নাম পরিবর্তন করে ‘কটন রিসার্চ, ট্রেনিং অ্যান্ড সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফার্ম’ রাখেন।
তুলা চাষকে অত্যন্ত লাভজনক ফসল হিসেবে অভিহিত করেছেন সিডিবির বিশেষজ্ঞ ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা। কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে পারলে একদিকে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করে ১৫ মণ কাঁচা তুলা উৎপাদন করা সম্ভব, যা থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা আয় করা যায়। প্রতি কেজি তুলা উৎপাদনে প্রায় চার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হয়। এছাড়া তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় এবং উর্বরতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত সহায়ক, যা ক্রমাগত ভুট্টা চাষের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে জমিকে রক্ষা করে। তুলা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগের ফলে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পাশাপাশি তুলাচাষিদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে এবং বিদেশ থেকে তুলা আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। পাট চাষের বিস্তার কমে যাওয়ার পর তুলা দেশের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন সিডিবির মৃত্তিকা পুষ্টি ও পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. মো. গাজী গোলাম মর্তুজা। তিনি বলেন, ‘দেশে তুলার মতো এতটা লাভজনক অন্য কোনো ফসল নেই।
তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সিডিবির জনবল সংকট একটি বড় অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। বোর্ডের অনুমোদিত ৮৬৪টি পদের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ৪৮৩ জন কর্মরত রয়েছেন, অর্থাৎ ৩৮১টি পদই বর্তমানে খালি। এই জনবল সংকট দূর করে আধুনিক কৃষিযন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে তুলা উৎপাদন বাড়াতে সরকার তৎপর রয়েছে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে বীজ বপন এবং ডিসেম্বরে ফসল সংগ্রহের মাধ্যমে এই উৎপাদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের বস্ত্রশিল্পের কাঁচামাল সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখবে।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০