ভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ফের ফিরে এসেছে গান্ধি বনাম গডসের আদর্শিক লড়াই। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অহিংস আন্দোলনের প্রধান মুখ মহাত্মা গান্ধি, যিনি ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নতুন দিল্লির বিড়লা হাউসে এক প্রার্থনা সভায় মহারাষ্ট্রের নথুরাম গডসের গুলিতে তার জীবনাবসান ঘটে। সেই শোকাবহ ঘটনা ভারতের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। তবে তিনি যে সবার প্রিয় নন, তা দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয় ভারতের স্বাধীনতার পরের বছর; অর্থাৎ, ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি। ২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি বিবিসির এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল—‘নথুরাম গডসে: মহাত্মা গান্ধির হত্যাকারীকে ঘিরে রহস্য’। এতে জানানো হয়, ৩৮ বছর বয়সী নথুরাম গডসে চরম ডানপন্থি দল ‘হিন্দু মহাসভা’র সদস্য ছিলেন। আদর্শগতভাবে এই সংগঠনটি ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপির ‘গুরু’। আরএসএস ক্ষমতার বাইরে থেকে মোদি সরকারে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে বলেও বিবিসির প্রতিবেদনটিতে জানানো হয়েছে।
নথুরাম গডসে ও আরএসএস সংযোগ
- নথুরাম গডসের পরিচয়: তিনি চরম ডানপন্থি দল হিন্দু মহাসভার সদস্য ছিলেন।
- অভিযোগ: গান্ধি মুসলিমদের প্রতি নমনীয় হয়ে হিন্দুদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন—এমন অভিযোগ ছিল গডসের।
- বিচার ও সাজা: হত্যার এক বছর পর আদালত গডসেকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, যা ১৯৪৯ সালের নভেম্বরে কার্যকর করা হয়।
- আরএসএস যোগসূত্র: বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিন্দু মহাসভায় যোগ দেওয়ার আগে গডসে আরএসএস-এর সদস্য ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ১৯৭২ সাল থেকে দীর্ঘ সময় আরএসএস-এর প্রচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে বর্তমানে এক ধরণের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের আমেজ দেখা যাচ্ছে, যেখানে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার লড়াইয়ে গান্ধির আদর্শকে অস্ত্র হিসেবে দেখছেন অনেকে। সাংবাদিক অনিকেত চট্টোপাধ্যায় তার পডকাস্টে উল্লেখ করেছেন, গান্ধিকে সামনে রেখেই বর্তমান রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে হবে। মহাত্মা গান্ধির নামের পাশে আরেকটি নাম উল্লেখ করা খুবই বিব্রতকর।
ভোটার তালিকা ও নির্বাচন কমিশনারের বিতর্ক
- অভিযোগ: ভোটার তালিকা থেকে যথাযথ কারণ ছাড়া ১৩ লাখেরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে।
- বিরোধী অবস্থান: কংগ্রেসসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই কর্মকাণ্ডকে সংবিধান লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
- জনগণের প্রতিক্রিয়া: রাহুল গান্ধি তার টুইটে ‘জ্ঞানেশ, ইট ইজ ডান, ব্রো’ লিখে আন্দোলনের প্রতীকী সমর্থন জানান।
- আরশোলাদের বিক্ষোভ: অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিবাদকারীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, পুলিশ দিয়ে দমনপীড়ন চালিয়ে এই দাবি থেকে তাদের সরানো যাবে না। গত ২ অক্টোবর মহাত্মা গান্ধির জন্মদিনে মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে এই প্রতিবাদের সুর জোরালো হয়। এছাড়া বিহারের অপারেশন গঙ্গাজল বা পুলিশি নির্যাতনের ইতিহাসের সাথে বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের তুলনা টেনে সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করছেন অনেকে। ভারত সরকারের পিএম ইন্ডিয়া ওয়েবসাইটে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জীবনীতে বলা হয়—১৯৭২ সালে তরুণ নরেন্দ্র মোদি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আরএসএস-এর প্রচারক হয়েছিলেন।
সরকারি পদক্ষেপে প্রশাসনিক বিতর্ক
- বিহারে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা এখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
- ১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে বিহার পুলিশের অপরাধীদের প্রতি আচরণ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক হয়েছিল, যা আজও ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষণে গুরুত্ব পায়।
ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমজনতার বড় একটি অংশ স্বচ্ছ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় রাজনৈতিক প্রভাব ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগ দেশজুড়ে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ৫ দেশে বিপ্লব-পরবর্তী নির্বাচন ও পরিণতি।






