
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে একত্রিত হয়েছিলেন। এই আয়োজনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ‘নিয়ম মেনে চলা’র পরিবর্তে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে ‘নিয়ম নির্ধারণকারী’ দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই জোট কারো বিরুদ্ধে গঠিত হয়নি। সম্মেলনে চীন, রাশিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দক্ষিণ আফ্রিকার শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। তবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ও সামরিক বৈরিতা থাকার কারণে এই সম্মেলনটি ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে ভারত ও চীনের সীমান্ত সংঘর্ষ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপরীতমুখী অবস্থান ব্রিকসের অন্দরে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করেছে। এই প্রতিকূলতাকে জয় করে নেতাদের একই টেবিলে বসানো ভারতের জন্য এক বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্মেলনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো ব্রিকসকে পশ্চিমা প্রভাব বলয় কমানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখতে চাইলেও ভারত এর সাথে একমত নয়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়াতের মতে, ভারত এই জোটকে কোনোভাবেই পশ্চিমবিরোধী হতে দিতে চায় না; বরং তারা ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ বজায় রেখে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করতে আগ্রহী। বিভাজন সত্ত্বেও সদস্য দেশগুলো একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে একমত হতে পেরেছে, যা গত কয়েক মাসের মন্ত্রী পর্যায়ের ব্যর্থতার তুলনায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তীব্র মতবিরোধের জায়গাগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলেই এই ঐকমত্য সম্ভব হয়েছে, যার ফলে বড় কোনো সংকট সমাধানের ইঙ্গিত এতে নেই।
ঘোষণাপত্রে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কোনো উল্লেখ না রাখাটা আগের সম্মেলনগুলোর তুলনায় একটি বড় পরিবর্তন। মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং বেসামরিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা করা হলেও নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম নেওয়া হয়নি। এছাড়া, ফিলিস্তিন ইস্যুতে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে জোট। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্ধি মনে করেন, কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করার মাধ্যমেই ভারতের ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক কৌশল ফুটে উঠেছে। পাশাপাশি, পরোক্ষভাবে একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও ক্রমবর্ধমান শুল্কের নিন্দা জানানো হয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রভাবকে প্রতিফলিত করে।
এই সম্মেলন সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোচনার পথ প্রশস্ত করেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সরাসরি বৈঠক ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সাথে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে তেহরান গুরুত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘ সাত বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফর ভারত-চীন সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করার ইঙ্গিত দেয়। সীমান্ত বিরোধের জেরে সৃষ্ট অবিশ্বাস সত্ত্বেও দুই নেতা ব্যবসা ও পরিবহন যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছেন। যদিও মোদি ও শি একে অপরের সাথে করমর্দন করেছেন, তবে গতানুগতিক আলিঙ্গনের অভাব এবং শি জিনপিংয়ের নৈশভোজে অনুপস্থিতি সম্পর্কের জটিলতাকেও স্পষ্ট করে দেয়।
ভারতের কূটনীতিকদের মতে, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীর ও সতর্ক। বিশ্বাস অর্জনের চেয়ে যাচাই করে এগিয়ে যাওয়ার নীতিতেই আস্থা রাখছে নয়াদিল্লি। ব্রিকস জোটের এই সম্মেলন বিশ্বমঞ্চে পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের বাইরেও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে আলোচনার নতুন একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে এই জোট ভবিষ্যতে ঠিক কী ধরনের বৈশ্বিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করবে, তা এখনো অস্পষ্ট। বর্তমান অস্থির বিশ্বরাজনীতিতে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে ঐক্যবদ্ধ থাকা ব্রিকসের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিশ্লেষণ / ইরান যুদ্ধে ব্রিকস দেশগুলোর সম্পর্কে কতটা পরিবর্তন এলো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে এসব দেশকে স্বাভাবিক মিত্র বলা কঠিন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ওই সংঘাতের সময় তেহরান ব্রিকসেরই সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা কেমন হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য তৈরি করা এবং সেখান থেকে স্পষ্ট ও বাস্তব ফলাফল অর্জন করা অনেক কঠিন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের সম্মেলনজুড়ে সেই টানাপোড়েনই স্পষ্ট ছিল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বিবিসি জানায়, চলতি বছরের শুরুতে ব্রিকসের মন্ত্রী পর্যায়ের দুটি বৈঠক যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০