ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় ‘বাধা হয়ে দাঁড়ালে’ মার্কিন মিত্র ওমানে বোমাবর্ষণের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ হুুঁশিয়ারি দেন। বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র পৃথকভাবে তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছে। গত ছয় মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি দিয়ে নৌচলাচল বন্ধ রয়েছে।
ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রেই ইংস্ট জানান, একটি ফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অশালীল ভাষা ব্যবহার করে ওমানকে বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেন। ঠিক কোন পদক্ষেপকে তিনি ‘বাধা’ হিসেবে দেখছেন, তা অবশ্য স্পষ্ট করেননি। এর আগে ইরানি কর্মকর্তারা জানান, ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর কাছাকাছি রয়েছেন তারা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ৬০ দিন মেয়াদি সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ শেষ হতে চলায় দুই দেশের আলোচনার ভবিষ্যত এখন অনিশ্চিত।
স্থানীয় সময় সোমবার (১৭ আগস্ট) হোয়াইট হাউজের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্পকে সমঝোতাস্মারকের মেয়াদ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সংক্ষেপে উত্তর দেন, “না।” গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে রাখে। বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এটি পুনরায় সচল করাই এখন আলোচনার মূল বিষয়।
হরমুজ প্রণালির দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত ওমান নিজেদের নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে দাবি করে আসছে। তা সত্ত্বেও যুদ্ধের কারণে একাধিক হামলার শিকার হয়েছে দেশটি। বর্তমানে প্রণালিটি খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের সঙ্গে মধ্যস্থতায় মূল ভূমিকা রাখছে ওমান। একই সময়ে ওয়াশিংটন নিজেদের মতো করে প্রণালিটি মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফক্সের সাংবাদিক ট্রেই ইংস্ট ট্রাম্পের উক্তি দিয়ে জানান, “ওমান যদি আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা বোমা মেরে ওদের গুঁড়িয়ে দেব।”
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ওমানের সাথে সমঝোতা হয়েছে- সোমবার (১৭ আগস্ট) ইরানের এমন ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্পের এই হুমকির কথা সামনে আসে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, জাহাজ চলাচলের রুট নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়েছে। বিস্তারিত চূড়ান্ত করার পর একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। ওমানও এর আগে এই আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছিল।
ফক্স নিউজের সঙ্গে একই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের শক্তিশালী সামরিক সংস্থা ‘ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী’ (আইআরজিসি)-এর সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সরাসরি একটি গোপন যোগাযোগ মাধ্যম রয়েছে। তবে ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে আইআরজিসি। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম নিউজ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইআরজিসির এক মুখপাত্র জানান, “মার্কিনদের সঙ্গে আমাদের কোনো আলোচনা চলছে না। ট্রাম্পের এই বক্তব্য যুদ্ধে পরাজয় ও হতাশা থেকে তৈরি হওয়া এক ধরনের অলীক কল্পনা ও দিবা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়।”
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানান, সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইরান ক্ষতিপূরণ পেলেই কেবল প্রণালিটি পূর্ণাঙ্গভাবে খুলে দেওয়া সম্ভব। রয়টার্স সূত্রের খবর অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর মালামালের মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ট্রানজিট ফি দাবি করছে তেহরান। গত ১৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালি আংশিক চালু করা। কিন্তু কিছুদিন পরেই উভয় পক্ষ ফের হামলায় পাল্টা-হামলায় জড়িয়ে পড়ায় স্মারকটি কার্যকরিতা হারায়।
ট্রাম্প আইআরজিসির সঙ্গে গোপন যোগাযোগের দাবি করলেও যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে তার যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, তাও স্পষ্ট করেছেন। ফক্সকে তিনি বলেন, “ওরা পোকার দক্ষ খেলোয়াড় হতে পারে, কিন্তু ওরা ধ্বংসের মুখে। আমার কোনো সময়সীমা নেই, আমি কোনো তাড়াহুড়োর মধ্যে নেই।” গত ৮ জুলাই নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলার পর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ‘শেষ’ বলে ঘোষণা দেন এবং ইরানের নেতৃত্বকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন। সোমবার সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার মুখে ট্রাম্প তার ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে লেখেন, “আমাদের এক নম্বর লক্ষ্য হলো এবং সবসময় থাকবে- ইরান কোনোভাবেই যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হতে না পারে।”






