সরকারি চাকরির প্রত্যাশায় লাখো তরুণ বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। এই স্বপ্নের পেছনে থাকে পরিবারের আশা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার দৃঢ় সংকল্প। কিন্তু সেই স্বপ্ন যখন প্রশাসনিক জটিলতা বা অব্যবস্থাপনার কারণে ধূলিসাৎ হয়, তখন প্রার্থীর কষ্টের সীমা থাকে না। সম্প্রতি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আসা প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর ক্ষেত্রে ঠিক এমনটিই ঘটেছে। মোট ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদনকারী এসব প্রার্থী পরীক্ষা দিতে কেন্দ্রে এসে জানতে পারেন যে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ততক্ষণে পরীক্ষা কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে গিয়েছিলেন, এমনকি কারও হাতে ওএমআর শিটও তুলে দেওয়া হয়েছিল। চাকরির জন্য তরুণদের পথে পথে ঘোরার কষ্টও নতুন কিছু নয়। বিশের দশকে ইংরেজিতে এমএ পাস করা মেধাবী তরুণ জীবনানন্দ দাশকেও মনের মতো একটা চাকরির জন্য ঘুরতে হয়েছে দিনের পর দিন। সেই খেদ থেকেই হয়তো লিখেছিলেন, ‘মানুষেরই হাতে তবু মানুষ হতেছে নাজেহাল; পৃথিবীতে নেই কোনো বিশুদ্ধ চাকরি।’। আমাদের কমবেশি সবার জীবনে চাকরিকে কেন্দ্র করে গল্পটা প্রায় এক না হলেও কাছাকাছি।
পরীক্ষা শুরুর আগমুহূর্তে এই ঘোষণা আসার বিষয়টি নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত কেন কর্তৃপক্ষ অপেক্ষা করল এবং প্রশ্নপত্র সুরক্ষিত রাখার দায়িত্বে কারা গাফিলতি করেছেন, তা এখন জনমনে বড় জিজ্ঞাস্য। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই বিশৃঙ্খলার ফলে মেধা ও পরিশ্রমের ওপর ভিত্তি করে প্রতিযোগিতা করার সুযোগটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশ্নপত্র আগেভাগে ফাঁস হওয়ার ফলে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতাটি আর সমমানের থাকেনি। কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এ ঘটনার তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে তদন্তের ফলাফল এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
সংবাদ মাধ্যমের তথ্যমতে, স্থগিত হওয়া পরীক্ষাটি আগামী ১৬ অক্টোবর পুনরায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে নতুন পরীক্ষার ঘোষণা অনেকের জন্য আশীর্বাদের চেয়ে বিড়ম্বনাই বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসা অনেক প্রার্থী ধারদেনা করে যাতায়াতের খরচ জোগাড় করেছিলেন। পরীক্ষাটি স্থগিত হওয়ার ফলে আগের ব্যয় বৃথা গেছে এবং ১৬ তারিখ পুনরায় পরীক্ষা দিতে হলে তাঁদের নতুন করে যাতায়াত ও আবাসন খরচ জোগাড় করতে হবে। সবার পক্ষে দ্বিতীয়বার এই আর্থিক চাপ নেওয়া সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষের দ্রুত পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত যৌক্তিক মনে হতে পারে, কিন্তু সেই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি ছিল। চাকরি, চাকরি, চাকরি—একটা চাকরি জীবন বদলে দিতে পারে।এই ভাবনা আজকের নয়, বহু পুরোনো। চাকরি বদলে নতুন চাকরিতে যুক্ত হয়েছেন কয়েকবার।
নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে চাকরিপ্রার্থীদের অনিশ্চয়তা বাড়ে, তা সত্য। কিন্তু পরীক্ষার অব্যবস্থাপনার দায় কেন প্রার্থীরা বহন করবেন? পরীক্ষার তারিখ নির্ধারণের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ এখন প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। চাকরিপ্রার্থীরা কেবল একটি পরীক্ষা নয়, বরং একটি স্বচ্ছ এবং নিরাপদ নিয়োগপ্রক্রিয়া প্রত্যাশা করেন। ১৬ তারিখের পরীক্ষায় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এই ভোগান্তির চক্র থেকেই যাবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি মানবিক দৃষ্টি না থাকলে মেধাবী তরুণদের এই কষ্ট ও হতাশার শেষ কোথায়, সেই প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে যাবে। কলকাতা থেকে বাগেরহাট, দিল্লি থেকে বরিশাল, বরিশাল থেকে দিল্লি কোথায় যাননি কবি।






