বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ উদ্যোগে তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্য কারিগরি সহায়তা এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছে নেদারল্যান্ডস সরকার। এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়ক মন্ত্রী শুর্দ শুর্দসমারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে তিস্তা প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা এবং কারিগরি সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে নেদারল্যান্ডসের প্রস্তাবকে ঢাকা ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এই বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সম্পর্কের নতুন দিগন্ত
বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, তিস্তা প্রকল্প, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি এবং রোহিঙ্গা সংকটসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী শুর্দ শুর্দসমার বলেন, বিনিয়োগ ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক আরও জোরদার করার এখনই উপযুক্ত সময়। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস উভয়ই বদ্বীপ রাষ্ট্র। ভৌগোলিক ও ভূ-প্রাকৃতিক সাদৃশ্য থাকায় অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে সহযোগিতার সুযোগ ব্যাপক। এ সময় প্রধানমন্ত্রী নেদারল্যান্ডসের সফল ভূমি পুনরুদ্ধার কৌশলের প্রতি গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, চর উন্নয়ন এবং অভিযোজনক্ষম নদীব্যবস্থাপনায় দুই দেশের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
বাণিজ্য, জ্বালানি ও রোহিঙ্গা ইস্যু
- মুক্ত বাণিজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী মুক্ত বাণিজ্যে আগ্রহ প্রকাশ করলে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে দেশটির সহায়তা কামনা করে।
- বাংলাদেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী। তিনি বিশেষ করে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক পরিকল্পনার উন্নয়নকে সাধুবাদ জানান।
- রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে জানায়, এই সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর টেকসই সমাধান সেখানেই নিহিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়।
- কৃষিখাতে প্রযুক্তি ও দক্ষতার সমন্বয় ঘটিয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।
গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি
বৈঠকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে সুসংহত করা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি অতীতে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান সরকার দেশে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক ধারাকে সুসংহত করতে বদ্ধপরিকর। বৈঠকের শেষ পর্যায়ে নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী শুর্দ শুর্দসমার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নেদারল্যান্ডস সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান।
বৈঠকে উপস্থিত উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ
আলোচনাসভায় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদি আমীন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত ইওরিস ভ্যান বোমেল। উভয় দেশের প্রতিনিধিদলই এই বৈঠককে দুদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিস্তা প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।






