
বিমানবাহিনীর বরখাস্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরীর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন রহস্যের উদ্ভব হয়েছে। পুলিশ মামলার তদন্তে নেমে ঘটনার রাতে তার সঙ্গে থাকা এক অজ্ঞাতপরিচয় তরুণীকে খুঁজছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মৃত্যুর আগে তাহসিফ উত্তরায় একটি রেস্টুরেন্ট ও বারে ওই তরুণীর সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন। বর্তমানে তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ওই তরুণীর বয়স ২৪-২৫ বছর।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপ তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান।
এরপর থেকে তাহসিফ নিখোঁজ ছিলেন। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকেলে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তার দেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ। পকেটে থাকা আইফোনের মাধ্যমে তার পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই ঘটনায় তাহসিফের বাবা কেএম এনায়েতুল করিম গত শুক্রবার রাতে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে উত্তরখান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে পিবিআইয়ের হেফাজতে থাকা দীপকে এই মামলায় সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয় এবং আদালত তাকে চার দিনের রিমান্ডে পাঠায়। পরদিন ২৮ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদে একটি লাশ ভাসার খবর পায় পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ঘটনার রাতে ২৭ অক্টোবর ১০টা ১৭ মিনিটে তাহসিফ ও তার ওই নারী সঙ্গী উত্তরায় ১১ নম্বর সেক্টরের 'নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার'-এ উপস্থিত হন। তাদের একটি মোটরসাইকেলে সেখানে আসতে দেখা যায়। বারের সিসিটিভি ফুটেজে তরুণীকে কেডস, প্যান্ট ও গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে, যার হাতে একটি সাদা পলিথিন ছিল। তদন্তকারীরা এখন ওই তরুণীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। পুলিশ ধারণা করছে, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার আগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া সম্ভব হবে। তাহসিফ নিখোঁজ হওয়ার আগে উত্তরার সোনারগাঁও জনপথ রোডের ১৩ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ‘নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার’-এ তাকে ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গিয়েছিল। এদিকে তাহসিফ সাউরির মৃত্যুরহস্য ঘিরে নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজ। পরিবারকে কী ধরনের সহযোগিতা করা যায়, তা জানতে চেয়েছেন তারা।
জিজ্ঞাসাবাদে দীপ দাবি করেছেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তারা পুলিশের ধাওয়া খেয়েছিলেন। তার ভাষ্যমতে, পুলিশের ভয়ে দৌড়ে পালানোর সময় তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন। তবে এই দাবির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তদন্তকারীদের। নৌপুলিশের ঢাকা রেঞ্জের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, দীপের বক্তব্যে কিছু অসংগতি ও এলোমেলো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পুলিশ এখন যাচাই করছে যে ওই এলাকায় আসলেই কোনো পুলিশি টহল ছিল কি না, অথবা মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে কি না। তবে তিনি কেন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, এরপর কী ঘটেছিল কিংবা তার মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা রয়েছে-এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর আল আমিন বলেন, এ ঘটনা তারা ছেড়ে দেবেন না।
তদন্তের খাতিরে তাহসিফের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়াও ঘটনার রাতে তিনি মোটরসাইকেলসহ কোন কোন স্থানে গিয়েছেন এবং কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরির কাজ চলছে। রিমান্ড শেষে এই বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মামলার তদন্তে দীপের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়ার কথা প্রাথমিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট হাসিব উল্লাহ পিয়াস শুনানি শেষে দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ঘটনাস্থলে তাহসিফের মোটরসাইকেল কীভাবে এলো, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে, তাহসিফের অকাল মৃত্যুতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অবসরপ্রাপ্ত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের সংগঠন 'রাওয়া'। সংগঠনের নেতারা গত শনিবার উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে তাহসিফের বাসায় তার পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন এবং শোক প্রকাশ করেন। রাওয়ার যুগ্মসম্পাদক অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু নওরোজ খুরশিদ আলম বলেন, তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখবেন। শনিবার দুপুরে উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউক অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পের ‘করবী’ ভবনে তাহসিফের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সংগঠনটির নেতারা। এ সময় তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তদন্তকারী দল এখন ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে আলামত উদ্ধারে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। দীপকে দফায় দফায় জেরা করে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য এবং ওই তরুণীর পরিচয় বের করার চেষ্টা চলছে। তুরাগ নদে তাহসিফের ঝাঁপ দেওয়া এবং এর পরের পরিস্থিতি নিয়ে দীপের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত মেলানোর কাজ চলছে বলে জানিয়েছে নৌপুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার রাতে ওই তরুণী টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে গিয়েছিলেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বর্তমানে সব তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পরিবারের পক্ষ থেকে ন্যায়বিচার ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০