
দেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের বিদ্যমান সংকট নিরসনে বড় ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল জানিয়েছেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার একটি বড় দরপত্র আহ্বান করা হবে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট দূর করা, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এছাড়া সব কমিউনিটি ক্লিনিকের নাম পরিবর্তন করে সেগুলোকে ‘ফ্যামিলি ওয়েলবিয়িং সেন্টার’ হিসেবে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রকৃতপক্ষে কতজন চিকিৎসক অনুপস্থিত ছিলেন, তা যাচাই করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম থাকায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক নিয়োগ, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহের ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। পরিদর্শনের সময় তিনি চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা চিকিৎসায় গাফিলতি কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের রোস্টার খাতা পরীক্ষা করে তিনি সতর্ক করে দেন যে, যারা দেরিতে উপস্থিত হন বা কাজে গাফিলতি করেন, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কয়েকজন চিকিৎসককে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের রোস্টার সংগ্রহ করা হয়েছে। সকাল ১০টা কিংবা পৌনে ১১টায় হাসপাতালে উপস্থিত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। দায়িত্বে অবহেলা বা চিকিৎসায় গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানান মন্ত্রী। রোগীদের চিকিৎসাসেবা, ওয়ার্ডের পরিবেশ, শৌচাগার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যবেক্ষণ করেন। ময়মনসিংহ ছাড়াও আশপাশের আট থেকে দশটি জেলার মানুষ এ হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। কাজের অগ্রগতি ভিডিওর মাধ্যমে দেখানোর নির্দেশনাও দেন তিনি। এসব প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার নামে অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রী গাইনি ওয়ার্ড, লেবার ওয়ার্ড ও ডেঙ্গু ওয়ার্ডসহ হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখেন। গাইনি ওয়ার্ডে এক রোগীর কাছ থেকে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনতে বাধ্য হওয়ার বিষয়টি জানার পর তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন এবং রোগীর হাতে নিজে সহায়তা তুলে দেন। ডেঙ্গু রোগীদের মশারির ব্যবস্থা মোটামুটি সন্তোষজনক মনে হলেও, রোগীদের তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচতলায় ময়লা ও শৌচাগারের বেহাল দশা দেখে মন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নির্দেশ দেন। গাইনি ওয়ার্ডে এক রোগীকে বাইরে থেকে স্যালাইন কিনে আনতে হয়েছে কেন, তা জানতে চান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান চাপের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী সেবা নিতে আসেন। প্রতিদিন এক হাজার ধারণক্ষমতার বিপরীতে তিন থেকে চার হাজার রোগী আসায় চিকিৎসা সেবায় স্বাভাবিকভাবেই চাপ পড়ে। বিগত ১৭ বছরে স্বাস্থ্য খাতে যে লুটপাট ও অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়। তবে জনবল সংকট নিরসনে সরকার ইতোমধ্যে পাঁচ হাজার নার্স এবং স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়াতে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এছাড়াও বন্ধ থাকা শিশুদের আইসিইউ এক সপ্তাহের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক যেখানে ৫০ জন রোগী দেখার সক্ষমতা রাখেন, সেখানে তাঁকে ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগী দেখতে হলে স্বাভাবিকভাবেই সেবার ওপর চাপ পড়ে। তবে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নিরসন করে জনগণের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে মন্ত্রী জানান, তারাকান্দা ও ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যাসংখ্যা ১০০ থেকে ১৫০-এ উন্নীত করা হবে। তারাকান্দায় শীঘ্রই ইনডোর সেবা চালু হবে এবং ফুলপুরের শৌচাগার মেরামতসহ সংস্কারকাজ আগামী দুই দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্যানসার চিকিৎসার জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয়, রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন এবং পাঁচটি রোবোটিক সার্জারি ব্যবস্থা আনার পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে।
সরকারি হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিকগুলোর অনিয়ম নিয়েও হুঁশিয়ারি দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে ক্লিনিক স্থাপনের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা রয়েছে এবং বিদ্যমান ক্লিনিকগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকবে। রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বা প্রলুব্ধ করে বেসরকারি ক্লিনিকে নেওয়ার দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে রোগীদের বেসরকারি ক্লিনিকে নিয়ে যেতে দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যমে অনিয়ম ও ভুলত্রুটি উঠে এলে সরকারের তা সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়। ভালো কাজের প্রশংসা এবং গঠনমূলক সমালোচনা করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের আহ্বান জানান। পরিদর্শনের সময় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন, ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান এবং বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. প্রদীপ কুমার সাহাসহ স্থানীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: পায়েল হোসেন রিন্টু,
মেইল: bdnewspost5@gmail.com
মোবাইল: 01713814445
২৮-সি-৪ শাকের প্লাজা, লেভেল-৫, টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০