নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিতে অর্থ লেনদেনের মতো গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে চার সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়েছে। এই অনুসন্ধানের আওতায় আসিফ মাহমুদ ছাড়াও মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম, সাবেক যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জুবায়ের হোসেন এবং উপসচিব মো. মাসুম আহমেদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা হচ্ছে।
দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে গঠিত এই অনুসন্ধান দলে আরও রয়েছেন সহকারী পরিচালক মো. নাসরুল্লাহ হোসেন এবং উপসহকারী পরিচালক ইমরান আকন ও রোমান উদ্দিন। দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা থাকাকালীন আসিফ মাহমুদ বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাকে সরিয়ে নতুন পদায়নের আদেশের বিনিময়ে ৭৬ লাখ টাকা গ্রহণ, ১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির জন্য ১ কোটি ৫ লাখ টাকা এবং পছন্দের জায়গায় পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ। এছাড়া সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দরপত্র ও কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গত ৩ সেপ্টেম্বর দুদকের অনুসন্ধান দলের প্রধান মো. জাহিদ কালাম যুব ও ক্রীড়া সচিবের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। এতে আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আসিফ মাহমুদের দায়িত্ব পালনকালীন নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য ও নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের ৭ মে ও ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিলের স্মারক অনুযায়ী বদলি সংক্রান্ত নথির সত্যায়িত অনুলিপি, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রদান ও বাতিলের নথি এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পদায়ন সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র চাওয়া হয়েছে।
আসিফ মাহমুদ বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং দলটি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে অভিযোগের সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি এবং আসিফ মাহমুদ নিজেই এসব অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। দুদকের এক কর্মকর্তা শুরুতে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানালেও পরে সেটিকে ভুলবশত বলা মন্তব্য হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই পরিস্থিতিতে জোটের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সংস্থার অনুসন্ধান শুরু হওয়ার পরও ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কোনো সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া না আসায় রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। তবে জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা এই নীরবতাকে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা হিসেবেই দেখছেন। খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী মনে করেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হলে সেটি শেষ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি বলেন, অনুসন্ধান নিরপেক্ষ হওয়া জরুরি এবং কারও প্রতি আক্রোশ থেকে যেন এটি না হয়। তার মতে, ১১ দল এনসিপির সঙ্গে জোট করেছে, আসিফ মাহমুদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় জোট নেবে না।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুও দুদকের অনুসন্ধান প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি আসিফ মাহমুদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, অভিযোগটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। অন্যদিকে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান দুদকের অনুসন্ধানকে স্বাগত জানালেও সতর্কতার সঙ্গে বলেন, অতীতে দুদককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের নজির রয়েছে। তাই এবার যেন নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা হয়, সেটিই তাদের দাবি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোটের শরিক দলের নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে একদিকে যেমন ঐক্যের প্রশ্ন থাকে, তেমনি থাকে জবাবদিহিতার বিষয়টিও। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনি প্রক্রিয়া কোন দিকে মোড় নেয়, আর অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অনুসন্ধানের যে অভিযোগ উঠেছে তার ব্যাখ্যা কী দাঁড়ায়—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আপাতত ১১ দলের নীরব অবস্থানকে তাই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাহলে একজন জোটসঙ্গীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলেও ১১ দল কেন নীরব। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে নানামুখী আলোচনা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনুসন্ধান শুরুর পরদিনই এ বিষয়ে আরও এক ধাপ এগিয়েছে দুদক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দুদকের চাওয়া নথির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান ও সহায়ক রেকর্ডপত্রও পাঠাতে বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়কে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এটা আসিফ মাহমুদ হোক বা অন্য যে-ই হোক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তবে অনুসন্ধানটি অবশ্যই নিরপেক্ষ হতে হবে এবং কারও প্রতি আক্রোশের কারণে হওয়া উচিত নয়।






