ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দর-কষাকষির পাশাপাশি দেশটির রাজনীতির অন্দরমহলে বড় এক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির বিপর্যয় এবং তাতে ইসরায়েলের ভূমিকার বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ওয়াশিংটনে নিজেদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ট্রাম্পের এমন পরাজয় ইসরায়েলের ডানপন্থি রাজনীতিকদের জন্য একটি বড় বিস্ময় হয়ে এসেছে। পোস্তগোলায় সড়ক ছেড়ে চায়ের দোকানে ট্রাক, নিহত ২। ট্রাম্পের জন্য এটি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কেন। ইসরায়েলের ‘ভেতরের শত্রু’ আরবরা ‘কিং মেকার’ হতে পারবে কি। নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল অ্যালোন পিঙ্কাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদলের’ মুখে।
দীর্ঘদিন ধরেই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করে আসছেন যে, ট্রাম্পের কাছ থেকে অবিচল সমর্থন আদায়ের ক্ষেত্রে তার চেয়ে দক্ষ আর কেউ নেই। যদিও গত বছর হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি কোনো অন্তহীন ‘বোকামিপূর্ণ বিদেশি যুদ্ধে’ জড়াবেন না। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান পাল্টা হামলা চালালে পুরো অঞ্চলে বড় যুদ্ধের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিল্পাঞ্চলে ড্রোন দিয়ে বিজিবির নজরদারি, এপিসিসহ ৩৩ প্লাটুন মোতায়েন। জিম্বাবুয়ের হয়ে টেস্ট অভিষেকের দুয়ারে ‘পাকিস্তানি পাইলট’ নাকভি। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা কোনো কাজেই আসেনি, বরং উল্টো ফল দিয়েছে। গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা বন্ধের আহ্বান জানানো কয়েকটি প্রস্তাবও এর মধ্যে রয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণেই হেরেছি: জেডি ভ্যান্স।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই গত সপ্তাহের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নির্বাচন এবং গত মঙ্গলবারের মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এই নির্বাচনগুলোতে জয় নিশ্চিত করতে দুই নেতা একে অপরের প্রতি জোরালো সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন এবং ভোটারদের মিত্রকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। একে অপরের ওপর বাজি ধরেছিলেন, হারলেন দুজনই। নিজ নিজ দেশের ভোটারদের প্রতি তারা আহ্বান জানান, যেন তাদের মিত্রকে সমর্থন দিতে সবাই ভোটকেন্দ্রে যান। তাই এটি কেবল একটি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়।’।
কিন্তু তাদের সেই যৌথ প্রচেষ্টা বিফলে গেছে।
ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে কম। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ট্রাম্পের দল। টেক্সাস ও কানসাসের মতো রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতেও বড় অগ্রগতি পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা।
ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক শিবলি তেলহামি এই ঘটনাকে ‘ট্রাম্পবাদ’ প্রত্যাখ্যানের একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সুনামি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, পররাষ্ট্রনীতি, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন সাধারণ ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর বড় প্রভাব ফেলেছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘে ইসরায়েলের সমালোচনা রুখতে ওয়াশিংটন ভেটো দিয়ে আসছে এবং বছরে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু এখন এই সহায়তার রাজনৈতিক মূল্য দিন দিন বাড়ছে।
তেলহামির জরিপ অনুযায়ী, মার্কিন ভোটারদের একটি বড় অংশ মনে করে, ইরান যুদ্ধের মতো ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী অভিযানে ট্রাম্প প্রশাসনকে প্ররোচিত করেছে নেতানিয়াহু প্রশাসন। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন মার্কিন ভোটারদের কাছে সম্পদের চেয়ে দায় হিসেবে বেশি বিবেচিত হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের জয় স্বীকার করে নিলেও ট্রাম্প আংশিকভাবে ইরান যুদ্ধের প্রভাবকে তার দলের পরাজয়ের কারণ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। তবে নেতানিয়াহু এখনও নিজের পরাজয় মেনে নিতে নারাজ এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। ইহুদি ভোটারদের মধ্যে নিজের দলের জয়কে জাতীয় সরকার গঠনের ভিত্তি হিসেবেও তুলে ধরেছেন তিনি। ট্রাম্পকে ভোটারদের প্রত্যাখ্যান, সেনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার আদলেই নেতানিয়াহু বর্তমানে নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন না করার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তিনি একতরফাভাবে অভিযোগ তুলছেন যে, বিদেশি শক্তিগুলো আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভোট অবৈধভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলি বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ মনে করেন, এসব পদক্ষেপ নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলছে। বিশেষ করে আরব নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে। প্রকল্প অনুমোদন / প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা পাবে পোশাক-জুতা, শিক্ষকরা পাবেন ট্যাব। ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারার পর ট্রাম্প যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন, ঠিক একই কায়দায় নেতানিয়াহুও নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন না করার হুমকি দিয়েছেন।
নির্বাচন চলাকালীন এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলের জন্য বছরে ৪০০ কোটি ডলারের অনুদান বন্ধ করার সমঝোতা হয়েছে। যদিও এর বিস্তারিত কারণ স্পষ্ট নয়, তবে ধারণা করা হচ্ছে, ইসরায়েলকে নিয়ে মার্কিন জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করতেই ট্রাম্প এমন মন্তব্য করেছেন। ইসরায়েলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের এই গভীর পরিবর্তনের প্রভাব এখনো অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। পিঙ্কাস বলেন, ‘৩৮০ কোটি ডলারের অনুদান বন্ধের বিষয়টি মার্কিন জনগণকে সন্তুষ্ট করার কোনো দেওয়া-নেওয়ার সমঝোতা ছিল কি না, তা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য না পাওয়া গেলেও ট্রাম্পের মন্তব্যের সময় নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। এর পরিণতি সম্পর্কে ইসরায়েলের বড় একটি অংশের ধারণা বা বোঝাপড়া—কোনোটিই যথেষ্ট নয়।
লেভি আরও বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরায়েল মূল ইস্যু না হলেও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্ককে ভোটাররা ‘ছোট মিত্রের বড় শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে দেখেছে। ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে ইসরায়েল যে বিপর্যয়কর সামরিক অভিযানে যুক্ত হয়েছে, তা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্কের রাজনৈতিক মাশুল বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার এই সময়ে ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠনের আলোচনাতেও এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এর একটি দিক হলো, ইসরায়েলের ভূমিকার কারণে সহজেই প্রভাবিত হওয়া একজন প্রেসিডেন্ট মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বিপর্যয়কর সামরিক অভিযানে জড়িয়ে পড়েছেন।’।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, ট্রাম্পের সঙ্গে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠতা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাড়ানোর রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, তবে এতে নেতানিয়াহুর অবস্থান আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ট্রাম্পের ওপর নির্ভরতা ইসরায়েলের জন্য এখন নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। ঘুরতে যেতে পারেন ভুতুড়ে এই ৮ জায়গায়।






