চলচ্চিত্রের ইতিহাসে যে কজন নির্মাতা নতুন ধারার সূচনা করেছিলেন, তাদের মধ্যে ঋত্বিক ঘটক অন্যতম। কাজটি করার সুযোগ পেয়ে অত্যন্ত আনন্দের কথাও জানিয়েছিলেন এই বরেণ্য নির্মাতা। কেবল সিনেমাই বানাননি, অনেককে বানানোও শিখিয়ে গেছেন ঋত্বিক ঘটক।
১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করা এই কালজয়ী পরিচালক নিজেকে ‘ব্রোকেন ইন্টেলেকচুয়াল’ বা ‘ভাঙা বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে অভিহিত করতেন। তিনি কেবল চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ক্যামেরা ধরেননি, বরং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই সিনেমাকে বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজকের দিনে তিনি বেঁচে থাকলে ১০১ বছর পূর্ণ করতেন। ৫০ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে মাত্র ৮টি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই তিনি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বছরের পর বছর ধরে বহু নির্মাতা ভারতীয় সিনেমাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। ৫০ বছরের জীবনে খুব বেশি সিনেমা উপহার দেন নি; মাত্র ৮টি সিনেমা নির্মাণ করে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি কুড়ান।
ঋত্বিক ঘটকের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজশাহীর মিয়াপাড়ার সঙ্গে। তার বাবা সুরেশচন্দ্র ঘটক ছিলেন একাধারে সরকারি কর্মকর্তা, কবি ও নাট্যকার। ১৯৫০ সালে নিমাই ঘোষ পরিচালিত ‘ছিন্নমূল’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমেই ঋত্বিক ঘটকের মধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাণের বীজ রোপিত হয়। সিনেমাটি রাশিয়ার বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ভেসভলোদ পুদোভকিনেরও প্রশংসা কুড়িয়েছিল। পরবর্তীতে ঋত্বিক নিজের পরিচালিত ‘সুবর্ণরেখা’ (১৯৬২), ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ (১৯৭৩) এবং ‘যুক্তি তক্কো আর গপ্পো’ (১৯৭৪) সিনেমায় অভিনয় করে দর্শকদের প্রশংসা পেয়েছিলেন। বিশেষ দিনে চলুন জেনে নিই, ঋত্বিক ঘটকের জানা-অজানা পাঁচ অধ্যায়। রুশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ভেসভলোদ পুদোভকিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল এটি। সিনেমাটি দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, পরবর্তীতে রাশিয়ায় মুক্তির জন্য সিনেমাটি কিনে নেন এই পরিচালক। পরবর্তীতে অনলাইন ডেটাবেসে তার নাম যুক্ত করা হয়।
তার বাণিজ্যিক ধারার প্রথম সিনেমা ‘অযান্ত্রিক’ মুক্তি পায় ১৯৫৮ সালে। সুবোধ ঘোষের ছোটগল্প অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি ভারতের প্রথম সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞানধর্মী চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। দরিদ্র ট্যাক্সিচালক বিমলের গাড়িকে কেন্দ্র করে আবর্তিত এই অসাধারণ গল্পটি ১৯৫৯ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’ সিনেমার মূল চরিত্রের সঙ্গে এর কিছুটা মিল খুঁজে পান অনেকে। দরিদ্র ট্যাক্সিচালক বিমলকে (কালী ব্যানার্জি) ঘিরে সিনেমাটির গল্প। সিনেমাটির কাহিনি নেওয়া হয়েছিল সুবোধ ঘোষের একই নামের একটি বাংলা ছোটগল্প থেকে।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি ঋত্বিক একজন নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকারও ছিলেন। দুর্ভিক্ষ ও দেশভাগের মর্মান্তিক পরিণতির প্রেক্ষাপটে তিনি পাঁচটি নাটক রচনা করেছিলেন। তার সৃষ্ট নাটকের সংকলন ‘চার্টার’ (দলিল)-এ ‘কমিউনিকেশন’ (সাঁকো), ‘অ্যাগনি’ (জ্বালা), ‘অ্যা ব্লেজ’ (জ্বলন্ত) এবং ‘দ্যাট ওম্যান’ (সেই মেয়ে)-এর মতো কাজগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে দুঃখজনকভাবে, নাটকগুলোর সঠিক রচনাকাল কিংবা মঞ্চায়নের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। নাটকগুলো ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করে ‘চার্টার’ (দলিল) নামে একটি সংকলনে প্রকাশিত হয়। দুঃখের বিষয় হলো, এই সংকলনে নাটকগুলো লেখার প্রকৃত তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।
উস্তাদ আলাউদ্দিন খানের জীবনভিত্তিক একটি তথ্যচিত্র ১৯৬৩ সালে নির্মাণ করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক। সংগীত নাটক আকাদেমির উদ্যোগে নির্মিত এই কাজটি নিয়ে দীর্ঘ সময় রহস্য ছিল, কারণ শুরুতে এতে পরিচালকের নাম ক্রেডিট লিস্টে ছিল না। ১৯৭৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে ঋত্বিক এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে বলেছিলেন, আলাউদ্দিন খান তার গুরু ছিলেন এবং কাজটির মাধ্যমে তিনি এমন অনেক অজানা তথ্য জানতে পেরেছিলেন যা আগে জানতেন না। আলাউদ্দিন সাহেব নিজেই আমাকে নানা গল্প শোনাতেন।
ঋত্বিক ঘটকের জীবনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল তার অসমাপ্ত চলচ্চিত্রগুলো। ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়া ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তার তিনটি অসমাপ্ত সিনেমার ফিল্ম রিল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। সিনেমাগুলো হলো—‘কত অজানারে’ (১৯৫৯), ‘বগলার বঙ্গদর্শন’ (১৯৬৩) এবং ‘রঙের গোলাম’ (১৯৬৮)। তার আপসহীন ব্যক্তিত্ব এবং সৃষ্টিশীল অবস্থানের কারণে অনেক সময় কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যেত বলে ধারণা করা হয়। তবে তার এসব সৃষ্টির মাঝেই দেশভাগের ক্ষত ও উদ্বাস্তু জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে, যা আজও বিশ্ব চলচ্চিত্রে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। যে তার গাড়িটিকে জীবন্ত কোনো সত্তা বলে মনে করে। ঋত্বিক ঘটকের নাটকগুলোতেও তার চলচ্চিত্রের মতোই বারবার ফিরে এসেছে দেশভাগ, উদ্বাস্তু জীবন, বাস্তুচ্যুতি ও মানুষের অস্তিত্বের সংকট। সিনেমাগুলোর ফিল্ম রিল সংরক্ষণ করা হয় গবেষণা ও শিক্ষামূলক কাজের জন্য। তবে তার স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব, আপসহীন মনোভাব, নিজের সৃষ্টিশীল অবস্থান থেকে সরে না আসার প্রবণতাকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।






