ইসরায়েলের নির্বাচনে আব্বাস: কিংমেকার নাকি কট্টরপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু?

প্রকাশ:
Print news

ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের প্রচারণার দিকে তাকালে মনসুর আব্বাসকে অনেকের কাছে বড় রাজনৈতিক হুমকি মনে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁকে সেভাবেই তুলে ধরা হচ্ছে। নেতানিয়াহু ইহুদি ভোটারদের সতর্ক করে বলছেন, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হলে পরবর্তী সরকারের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারেন মনসুর আব্বাস। ৫২ বছর বয়সী মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের ‘ইউনাইটেড আরব লিস্ট’ বা ‘রাম’ নামে পরিচিত একটি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতা। রাম ইসরায়েলে মুসলিম পরিচয়কে শক্তিশালী করতে এবং আরব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়িত করতে কাজ করে। মনসুর আব্বাস ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের বেদুইন শহর তুবা-জাঙ্গারিয়ার এক জনসভায় শত শত ভোটারের উদ্দেশে বক্তৃতায় আশ্বাস দেন, ‘ক্ষমতাবানদের টেবিলে আমরা আর অনাথ হয়ে থাকব না। কেউ কেউ অবশ্য মনসুর আব্বাসকে দেশের সবচেয়ে কৌশলী রাজনীতিবিদ বলে থাকেন। তবে শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে সরানোর জন্য বিরোধীদের সঙ্গে জোট বাঁধেন আব্বাস। নেতানিয়াহুকে হটাতে ‘টুগেদার’ জোট গঠন করলেন বেনেট ও লাপিদ। পাশাপাশি গাজা সীমান্ত এলাকা থেকে পালিয়ে আসা ইসরায়েলিদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে সাহায্য করেন। অন্যান্য আরব দলগুলোর নেতারা, তাঁরা মনসুর আব্বাসকে যেন ‘বেইমান’ বলতে বাকি রেখেছেন। সম্প্রতি তুবা-জাঙ্গারিয়া এলাকায় গোধূলিলগ্নে শত শত মুসলিম পুরুষ সাদা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে তাঁর কথা শুনছিলেন। মনসুর আব্বাস বলেন, তিনি যে পথে আছেন, সে পথের জন্য আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। এর কয়েক দিন পর নাজারেথে এক সংবাদ সম্মেলনে মনসুর আব্বাস তাঁর এ যাবৎকালের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপটি নেন। হাইস্কুলে পড়ার সময় প্রায়ই তাঁকে শিক্ষার্থীদের মধ্যস্থতা করতে বলা হতো। তিনি নিজ শহরে দ্রুজ এবং খ্রিষ্টানদের মধ্যে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া দেখেছেন। স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ঘরবাড়ি নতুন করে গড়ে তোলার মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত তিন নিজের পেশা বন্ধ রেখেছিলেন।

বাস্তবতা হলো, আব্বাসের নির্বাচনী এজেন্ডায় ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর বা গাজার চেয়ে ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ আরব। ১৯৯৬ সালে ইসলামিক মুভমেন্টের একটি শাখার হাত ধরে গঠিত রক্ষণশীল এই দলটি ইসরায়েলি ইহুদি দলগুলোর সাথে জোট বাঁধার মাধ্যমে দেশটির রাজনীতিতে এক নতুন পথ তৈরি করেছে। বরং তাঁর পুরো মনোযোগ ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ওপর।

মনসুর আব্বাসের লক্ষ্য হলো নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারকে হটিয়ে এমন একটি সরকার গঠন করা, যেখানে আরব নাগরিকদের কথা বলার সুযোগ ও প্রভাব থাকবে। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, তার লড়াই মূলত বর্ণবাদী ও কট্টরপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে। তার ভাষ্য, ‘এমন সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই যেখানে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা থাকবে।’

২০২১ সালে নেতানিয়াহুর টানা ১২ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পেছনে মনসুর আব্বাসের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমবারের মতো কোনো আরব দল মূলধারার ইসরায়েলি সরকারে যোগ দিয়ে ইতিহাস গড়েছিল। যদিও পরের বছর নির্বাচনে জয়ী হয়ে নেতানিয়াহু আবার ক্ষমতায় ফেরেন এবং বর্তমানে ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে কট্টরপন্থী সরকার পরিচালনা করছেন। ডানপন্থী ইসরায়েলিরা যাঁকে সবচেয়ে বেশি ভয় পান, সেই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি এই মনসুর আব্বাস। ইসরায়েলের কট্টরপন্থী ইহুদিদের সহিংস অপরাধ ও বৈষম্যমূলক আবাসন নীতির ভুক্তভোগী এই নাগরিকেরা। ২০২১ সালে মনসুর আব্বাস প্রথমবার সবার নজর কাড়েন সেই সময় নেতানিয়াহুর নতুন সরকারে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁর সঙ্গে আলোচনা চালানোয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাসের আক্রমণের পর ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। হামাস ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে হত্যা এবং ২৫০ জনকে জিম্মি করে নিয়ে যায়। এই ঘটনার পর থেকে অনেক ইহুদি নাগরিক ইসরায়েলের আরবদেরও হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মনসুর আব্বাস হামলার দিনই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং ইহুদিদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা জোরদার করেন। তবু ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, মনসুর আব্বাস ততই আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। পাশে সেগালোভিচকে নিয়ে মনসুর আব্বাস হিব্রু ভাষায় বলেন, ‘পরিবর্তন আনতে হলে অন্য মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে, শত্রু হিসেবে নয়।’।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, নেতানিয়াহু ও তাঁর সমর্থকরা আব্বাসকে সন্ত্রাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে চিত্রিত করে আক্রমণ তীব্রতর করছেন। এমনকি একসময় যারা তাকে সাহসী পথপ্রদর্শক মনে করতেন, তারাও এখন কট্টরপন্থী ভোটারদের মন জয়ে দূরত্ব বজায় রাখছেন। এ সত্ত্বেও আব্বাস অবিচল। তিনি তুবা-জাঙ্গারিয়ার মতো অঞ্চলে জনসভায় আরব ও ইহুদিদের মধ্যে মেলবন্ধনের বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন।

তার সাম্প্রতিক সাহসী পদক্ষেপের অংশ হিসেবে তিনি ঘোষণা করেছেন, সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ও মধ্য-বামপন্থী ইহুদি ইয়াভ সেগালোভিচ তাঁর দল ‘রাম’-এর প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করবেন। এটি মূলধারার আরব ও জায়নবাদী ইহুদি রাজনীতিবিদদের মধ্যে প্রথম কোনো জোটবদ্ধতার ঘটনা। সেগালোভিচ জানান, তার উপমন্ত্রী থাকাকালে আরব শহরগুলোতে অপরাধ দমনে আব্বাসের নজরদারিতে অপরাধের হার ১৬ শতাংশ কমেছিল। যদিও ২০২২ সালে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় আসার পর সেই উদ্যোগগুলো বাতিল করা হয়। তিনি ঘোষণা করেন, মধ্য-বামপন্থী আইনপ্রণেতা এবং সাবেক শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ইহুদি ইয়াভ সেগালোভিচ ‘রাম’-এর প্রার্থী তালিকার ২ নম্বর পজিশনের প্রার্থী হবেন।

গ্যালিলির মাঘার শহরে জন্ম নেওয়া দন্ত চিকিৎসক মনসুর আব্বাসের রাজনীতিতে আসার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

স্থানীয় পর্যায়ে শান্তি বজায় রাখা ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর ২০১৯ সালে তিনি নেসেটে প্রবেশ করেন।

তবে এই কাজের জন্য তিনি চড়া মূল্যও দিচ্ছেন। একদিকে কট্টরপন্থী ইহুদিদের আক্রমণ, অন্যদিকে পশ্চিম তীর ও গাজার ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে আপস করার কারণে নিজ সম্প্রদায়ের একাংশের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন তিনি। অ্যাব্রাহাম ইনিশিয়েটিভসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর রেকর্ড ২৫২ জন আরব নাগরিক নিহত হয়েছেন, যা আরব নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

নিজের রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে আব্বাস বলেন, বড় সাফল্য পেতে হলে ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতার ব্যবহার প্রয়োজন। যদিও এর ফলে বিভিন্ন সময় জনসম্মুখে তার অবস্থানের কড়া সমালোচনা হচ্ছে। ইসলামিক মুভমেন্টের চেয়ারম্যান সাফওয়াত ফ্রেজের মতে, তার নীতি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অনেক আরব নাগরিকই মনে করেন, এই আপস ও সমঝোতাই তার টিকে থাকার মূলমন্ত্র। তাঁর মতে, মানুষকে আরও সেবা দেওয়ার একমাত্র উপায় হলো রাষ্ট্রযন্ত্র বা রাষ্ট্রের মাধ্যমগুলো ব্যবহার করা।

নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে এখন দেখার বিষয়, মনসুর আব্বাস কি আবারও ইসরায়েলি রাজনীতিতে ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন কি না। ভোটার ইহসান বশিরের মতো অনেকেই আব্বাসকে পরবর্তী সরকারে আরবদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার অনুরোধ করছেন। বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অনেকেই তাঁর দ্বারস্থ হতো।

শেয়ার করুন
শিরোনাম :
জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসছে বড় পরিবর্তন পশ্চিম তীরে কূটনীতিকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ইসরাইলি স্পাইওয়্যার দিয়ে আল-জাজিরা সাংবাদিকদের ফোনে হামলা ইংল্যান্ড জাতীয় কাবাডি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজনগরের আনিসা খান বরুড়ায় ১৩ কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ইরফানের: তৌসিফ জানালেন ‘হৃদয় ভেঙে দিয়েছে’, নিরাপত্তা নিয়ে ইসরায়েলের নির্বাচনে আব্বাস: কিংমেকার নাকি কট্টরপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু? প্রধানমন্ত্রী |: তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ ডুবি: সাগরে ভাসছে আইফোন ও পারফিউম কলকাতায় পূজামণ্ডপে পদদলিত হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু লক্ষ্মীপুরে দুর্গোৎসবের মণ্ডপে কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু না ফেরার দেশে ঢাকা জেলার কোচ মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন ঝিনাইদহে পারিবারিক বিরোধে পৃথক ঘটনায় প্রাণ গেল দুই ভাইয়ের ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিকসে সিনিয়র ম্যানেজার পদে নিয়োগ মুম্বাইয়ে অজয় দেবগনের সম্পত্তির অংশবিশেষ ভাঙল পৌর কর্তৃপক্ষ লালনের তিরোধান দিবসে সাধু-ভক্তদের পদচারণায় মুখর ছেঁউড়িয়া নিরাপত্তাজনিত কারণে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করল বিমান বাকুতে সিকা সম্মেলনে কাতারের আমিরের আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান শামা ওবায়েদ: ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদির কাছে তথ্য আইডিআরএ: বীমা দাবির টাকা দিয়ে নতুন পলিসি নিতে বাধ্য জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে আসছে বড় পরিবর্তন পশ্চিম তীরে কূটনীতিকদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ইসরাইলি স্পাইওয়্যার দিয়ে আল-জাজিরা সাংবাদিকদের ফোনে হামলা ইংল্যান্ড জাতীয় কাবাডি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাজনগরের আনিসা খান বরুড়ায় ১৩ কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ইরফানের: তৌসিফ জানালেন ‘হৃদয় ভেঙে দিয়েছে’, নিরাপত্তা নিয়ে ইসরায়েলের নির্বাচনে আব্বাস: কিংমেকার নাকি কট্টরপন্থীদের লক্ষ্যবস্তু? প্রধানমন্ত্রী |: তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে সবার জন্য হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ ডুবি: সাগরে ভাসছে আইফোন ও পারফিউম কলকাতায় পূজামণ্ডপে পদদলিত হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু লক্ষ্মীপুরে দুর্গোৎসবের মণ্ডপে কাজ করার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু না ফেরার দেশে ঢাকা জেলার কোচ মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন ঝিনাইদহে পারিবারিক বিরোধে পৃথক ঘটনায় প্রাণ গেল দুই ভাইয়ের ল্যাবএইড ডায়াগনস্টিকসে সিনিয়র ম্যানেজার পদে নিয়োগ মুম্বাইয়ে অজয় দেবগনের সম্পত্তির অংশবিশেষ ভাঙল পৌর কর্তৃপক্ষ লালনের তিরোধান দিবসে সাধু-ভক্তদের পদচারণায় মুখর ছেঁউড়িয়া নিরাপত্তাজনিত কারণে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করল বিমান বাকুতে সিকা সম্মেলনে কাতারের আমিরের আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান শামা ওবায়েদ: ২ বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে সৌদির কাছে তথ্য আইডিআরএ: বীমা দাবির টাকা দিয়ে নতুন পলিসি নিতে বাধ্য