এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ইয়েমেনে চলা গৃহযুদ্ধ বর্তমান ভূরাজনীতিতে এক জটিল রূপ নিয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী এবং সৌদি আরব-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যকার এই লড়াই এখন কেবল অভ্যন্তরীণ বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই। সংঘাতের এই দীর্ঘপথ পরিক্রমায় একাধিক আঞ্চলিক শক্তি ও সশস্ত্র গোষ্ঠী জড়িয়ে পড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
হুতিরা, যারা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত, বর্তমানে ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির একটি বিশাল অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সরাসরি সামরিক অভিযান শুরু করে। তবে দীর্ঘদিনের বিমান হামলা ও সামরিক তৎপরতা সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হয়নি, যার ফলে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর হুতিদের বৈশ্বিক পরিচিতি নতুন মাত্রায় পৌঁছায়। গাজার প্রতি সংহতি প্রকাশের নামে তারা ইসরায়েল এবং লোহিত সাগরে চলাচলকারী বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে একের পর এক হামলা চালায়। এই কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যকে দারুণভাবে ব্যাহত করেছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোও এই সংঘাতের সরাসরি অংশ হয়ে পড়েছে।
তবে গত কয়েক বছরে সৌদি আরবের কৌশলগত অবস্থানে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান দীর্ঘদিনের বৈরিতা কমিয়ে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে রিয়াদ সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমাধানের পথ অনুসন্ধানে বেশি মনোযোগী হয়েছে। এর ফলে ইয়েমেন পরিস্থিতিতে এক ধরনের বাস্তববাদী পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করছে প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)। ২০২২ সালে গঠিত এই কাউন্সিলের মূল লক্ষ্য হলো দেশ পরিচালনা করা এবং একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। কাউন্সিলটিতে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে পিএলসির ভেতরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নিজস্ব স্বার্থের সংঘাত এবং পারস্পরিক মতপার্থক্য কার্যকর ও স্থায়ী ঐক্যের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শক্তির মধ্যে রয়েছে ‘ইসলাহ’ নামে পরিচিত ইয়েমেনি কংগ্রেগেশন ফর রিফর্ম, যা একটি সুন্নি রাজনৈতিক আন্দোলন। ঐতিহাসিকভাবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই দলটি সরকারি জোটের অংশ হলেও এর সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক এজেন্ডা স্বতন্ত্র। এছাড়া, সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত আলি আবদুল্লাহ সালেহর ভাতিজা তারেক সালেহের নেতৃত্বাধীন ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস’ হুতিবিরোধী লড়াইয়ে অত্যন্ত সক্রিয়। সৌদি আরবের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এই বাহিনী পিএলসির বৃহত্তর কাঠামোর অধীনে হুতিদের মোকাবিলায় একটি বড় সামরিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত।
পরিশেষে, ইয়েমেনের এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে কেবল হুতি ও সরকারের মধ্যকার সমঝোতা যথেষ্ট নয়। দেশটির উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, আঞ্চলিক শক্তি ইরান ও সৌদি আরবের অবস্থান এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত থাকায় এটি এক জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। আল-জাজিরার তথ্যসূত্র অনুযায়ী, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দেশীয় রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীর সমঝোতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তির সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইয়েমেনের রাজধানী সানা-সহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও হুতিদের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু এসব সামরিক অভিযান গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে পারেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বরং যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইয়েমেনে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এর ফলে দুই আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে তুলনামূলক বাস্তববাদী ও কম সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন তারেক সালেহ। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ইয়েমেনের সংঘাতকে শুধু হুতি ও সরকারের মধ্যকার দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে এর জটিলতা পুরোপুরি বোঝা যায় না।






