ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে যাতায়াতের সুবাদে সেখানকার উদ্ভিদ-উদ্যান ও জার্মপ্লাজম সেন্টারের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদের সঙ্গে এক ধরনের সখ্য গড়ে উঠেছে। এই কেন্দ্রটিতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন উদ্ভিদ যুক্ত হচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে এমন দুটি ফল বা সবজির দেখা মিলেছে, যা অনেকের কাছেই অপরিচিত। এর একটি হলো তৈকর এবং অন্যটি গ্যাক বা বনকাঁকরোল।
তৈকর স্থানীয়ভাবে তিকুল বা তিকুর নামেও পরিচিত। এটি একটি মাঝারি আকৃতির পাতাঝরা বৃক্ষ, যা ১৮ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর দেহকাণ্ড খাঁজকাটা এবং বাকল গাঢ় ধূসর থেকে বাদামি রঙের ও মসৃণ হয়। গাছটির শাখাগুলো খাটো ও ছড়ানো থাকে। এর পাতা সরল, প্রতিমুখ, ৫ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা, দীর্ঘায়ত ও পুরু। তৈকর গাছ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু চিরহরিৎ অরণ্যে জন্মে। বাংলাদেশে মূলত রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে এটি প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায়। এছাড়া ভারতের আসাম রাজ্যেও এই ফলের চাষ হয়।
তৈকর গাছে বছরে দুবার ফলন পাওয়া যায়। প্রথমবার আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে এবং দ্বিতীয়বার ফেব্রুয়ারি মাসে ফুল আসে। প্রথম দফায় নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর এবং দ্বিতীয় দফায় এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে ফল সংগ্রহের উপযোগী হয়। একটি পরিণত গাছে ৩০০ থেকে ৩৫০টি ফল ধরে এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ৭০ থেকে ৭৫ টন পর্যন্ত হতে পারে। পরিপক্ব ফলের রং হলুদ ও রসালো হয়, যার ওজন ৭০০ থেকে ৭৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। প্রতিটি ফলে ৮ থেকে ১০টি রসালো বীজ থাকে এবং এর স্বাদ টক-মিষ্টি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৯৯৬ সালে ‘বারি তৈকর-১’ নামে একটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এটি কেবল পুষ্টি ও ঔষধি গুণসম্পন্ন নয়, বরং আঠা ও রং তৈরিতেও কার্যকর। এর কাঠ তক্তা ও কড়িকাঠ হিসেবে গৃহ নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। সিলেটের স্থানীয়রা কচি ফল তরকারিতে ব্যবহার করেন এবং আচার বা জ্যাম-জেলি তৈরিতেও এটি জনপ্রিয়।
অন্যদিকে, বনকাঁকরোল বা গ্যাক (Momordica cochinchinensis) একটি লতানো উদ্ভিদ, যা ১৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এটি সাধারণত বাগানের বড় গাছ বেয়ে উপরে ওঠে। এর পাতা হৃৎপিণ্ডাকৃতি বা প্রশস্ত ডিম্বাকার, যার কিনারা ঢেউখেলানো ও দাঁতানো। বনকাঁকরোলের প্রতিটি ফলের ওজন সাধারণত আধা কেজির মতো হয়, তবে কোনো কোনোটি এর চেয়েও বড় হতে পারে। এটি দেশি জাতের কাঁকরোলের মধ্যে সবচেয়ে বড়। একসময় গ্রামীণ ঝোপঝাড়ে প্রাকৃতিকভাবে জন্মালেও বর্তমানে এটি দুষ্প্রাপ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী বনভূমিতে এই বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদটি খুঁজে পেয়েছেন এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ২২ জাতের কাঁকরোল সংরক্ষণ করেছে, তবে তাদের সংগ্রহে এই বড় জাতের বনকাঁকরোলটি নেই।
বনকাঁকরোলের স্বাদ হালকা তেতো এবং এটি সবজি হিসেবে রান্নার পাশাপাশি ক্যানডি ও জ্যাম তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর বীজের চারপাশে থাকা লাল ও তৈলাক্ত শাঁস বা অ্যারিল রান্নায় ব্যবহার করা হয়, যা ভারতের কোনো কোনো অঞ্চলে ‘জোই গ্যাক’ নামে পরিচিত। ভিয়েতনামে বিভিন্ন উৎসব ও বিয়েতে এই পদ্ধতিতে রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হয়। এই উদ্ভিদটির পাতার বোঁটা বেশ মজবুত এবং ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এর ফুলগুলো হলুদ থেকে সাদা রঙের এবং পাপড়িগুলো ডিম্বাকার থেকে আয়তাকার হয়ে থাকে। প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক মোকারম হোসেনের মতে, এই অপ্রচলিত ফলগুলো সঠিক সংরক্ষণের মাধ্যমে আমাদের খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।






