চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর পাহাড়ি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানের পর দৃশ্যপট অনেকটা বদলেছে। বর্তমানে সেখানে পুলিশের তল্লাশিচৌকি এবং দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়েছে। নিয়মিত টহলও চলছে। তবে প্রশাসনের ‘পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ প্রতিষ্ঠার দাবি সত্ত্বেও স্থানীয় বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পুরোপুরি অধীনে আসেনি। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের মতো মৌলিক সেবাগুলো এখনো অনেকটা আগের মতোই প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও স্থানীয় সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদার শাহ আলম জানান, দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ব্যবসা করলেও তিনি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) কোনো বিল পান না। এখনো ‘ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’ নামের একটি সংগঠনের রসিদে তাকে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে হয়। পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুরে মাত্র ২২টি বৈধ মূল সংযোগ রয়েছে। এসব সংযোগ থেকে অসংখ্য সাব-লাইন ছড়িয়ে বসতিতে বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। কোনটি বৈধ আর কোনটি অবৈধ, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে নেই। এমনকি বকেয়া বিলের কারণে জুলাই মাসে টানা ১৫ দিন এলাকাটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। পিডিবির ষোলশহর বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ছানা উল্লাহ জানান, ২২টি সংযোগের বিপরীতে বকেয়া বিলের পরিমাণ ছিল ৭২ লাখ টাকা, যার মধ্যে ৪৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি ২৮ লাখ টাকা পরিশোধের জন্য ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।
পানি সরবরাহের ক্ষেত্রেও একই বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান। গভীর নলকূপ ও পাম্পের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হলেও এর কোনো সমন্বিত হিসাব নেই জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের কাছে। গত ২৬ জুলাই আলীনগরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে পানি সরবরাহের পাইপলাইনে বিষাক্ত দ্রব্য মেশানোর ঘটনা ঘটে। পাইপলাইন কেটে ভেতরে কীটনাশক জাতীয় পদার্থ ঢোকানো হয়েছিল, যা পান করে তিন পুলিশ সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে ৩ হাজার ১৭৩ সদস্যের একটি বড় যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার এবং বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি ও সিসি ক্যামেরা উদ্ধার করা হয়। এরপরই এলাকাটিতে তল্লাশিচৌকি ও ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। কিন্তু সেই ঘোষণার আড়াই মাসের মাথায় ২৪ মে রাতে আলীনগরের যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ক্যাম্প লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এবং রাস্তা কেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলাচল বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে।
স্থানীয়দের মধ্যে এখনো আতঙ্ক কাটেনি। আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের বাসিন্দা রফিক উদ্দিন জানান, পুলিশ ক্যাম্প থাকা সত্ত্বেও হামলার ঘটনায় বাসিন্দারা শঙ্কিত। স্থানীয়দের আশঙ্কা, মো. ইয়াসিন ও তাঁর প্রধান সহযোগীরা গ্রেপ্তার না হলে তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে দখল নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী দাবি করেছেন, এলাকাটি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ইয়াসিন ও রোকনসহ জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে গড়ে তোলা হয়েছে অন্তত ৩০টি প্লট। আলীনগরে আড়াই কাঠার একেকটি প্লট ৩০ লাখ টাকা এবং ছোট প্লট ৫ লাখ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ২৬ হাজার ছোট প্লটের মধ্যে ২৩ হাজারই বিক্রি হয়ে গেছে। এসব প্লটের কোনো বৈধ দলিল বা নিবন্ধন নেই। ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সরকারের উচ্চপর্যায়ের সভায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে বর্তমান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার তথ্যমতে, বর্তমানে সেখানে খাসজমি রয়েছে প্রায় এক হাজার একর। আগের হিসাবটি সলিমপুর ইউনিয়নের পাঁচটি মৌজার সম্মিলিত আয়তন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারি জমির এই হিসাবের গরমিল এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, আতঙ্ক দূর করতে পুলিশ নিয়মিত বাসিন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ঘোষণার পরও কেন বিদ্যুৎ ও পানির মতো সেবাগুলো এখনো অবৈধ বা অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সব সংযোগ একসঙ্গে বিচ্ছিন্ন করলে সরকারি কার্যক্রম ও পুলিশ ক্যাম্পের সেবা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় পিডিবি যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু গত ৪ আগস্ট সরেজমিন দেখা গেল, বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন চালানো বিদ্যুৎ ও পানির বড় অংশ এখনো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বাইরে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আগে জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশপথে সশস্ত্র পাহারা থাকত; অপরিচিতদের বিশেষ পরিচয়পত্র দেখাতে হতো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানুষ আগের চেয়ে অবাধে চলাচল করেন, দোকানপাটও খোলা থাকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রকাশ্যে অস্ত্রধারীদের আনাগোনা নেই। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গত মাসের বিভিন্ন সময়ে আলীনগরের ১৫ বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: তাঁদের আশঙ্কা, এলাকাটির নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত মো। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সরকারের কাছে তাঁদের দাবি, বিকল্প বাসস্থান ব্যবস্থা করে যেন স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাইলট উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন বাজারে ২০ বছর ধরে দোকান চালান শাহ আলম।






