দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার ফুটবলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকা লিওনেল মেসি অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর থেকে ২০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে মাঠে নেমে ১২৫টি গোল করেছেন এই মহাতারকা। দীর্ঘ এই যাত্রায় উত্থান-পতন, শিরোপার আক্ষেপ এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বজয়ের স্বাদ—সব মিলিয়ে মেসির ক্যারিয়ার যেন এক রূপকথার গল্প।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল নাটকীয়। ২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে বুদাপেস্টে অভিষেক ম্যাচে মাঠে নামার মাত্র ৯০ সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখেছিলেন তিনি। তবে পরের বছরই জার্মানি বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয়ে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় তাঁর এবং সেই ম্যাচে গোল করে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তরুণ মেসি।
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ ছিল মেসির ক্যারিয়ারের এক বড় মোড়। বার্সেলোনায় সাফল্যের চূড়ায় থাকলেও জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা তখন অধরা। গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে গেলেও মারাকানায় জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের হারে স্বপ্নভঙ্গ হয় তাঁর। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে টানা দুইবার হারের পর হতাশায় মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সাময়িক অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বলেছিলেন, চারটি ফাইনালে খেলে চ্যাম্পিয়ন হতে না পারাটা তাঁকে প্রচণ্ড কষ্ট দেয়। তবে ছয় সপ্তাহের মধ্যেই তিনি সেই সিদ্ধান্ত বদলে আবার জাতীয় দলে ফিরে আসেন।
২০১৮ সালে লিওনেল স্কালোনি আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নেওয়ার পর মেসির ক্যারিয়ারে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। ২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরা কাটায় আর্জেন্টিনা। অ্যাঞ্জেল দি মারিয়ার গোলে ব্রাজিলকে হারিয়ে মেসি পান তাঁর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ছিল মেসির ক্যারিয়ারের শ্রেষ্ঠ সময়। ৩৫ বছর বয়সে কাতারে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা মেসি সাত ম্যাচে সাত গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট করেন। ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং টাইব্রেকারে সফল স্পট কিক থেকে গোল করে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জেতান তিনি। সেই ট্রফি জয়ের পর মেসি বলেছিলেন, তিনি এর চেয়ে বেশি কিছু আর চাইতে পারেন না এবং ক্যারিয়ার শেষ করার জন্য এটিই ছিল তাঁর স্বপ্নের সমাপ্তি।
তবে বিশ্বজয়ের পরও তিনি খেলা চালিয়ে যান। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকা জয় করেন। এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপে রেকর্ড ষষ্ঠবারের মতো অংশ নেন ৩৯ বছর বয়সের কাছাকাছি থাকা মেসি। বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ ম্যাচেই আট গোল করে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে নিয়ে যান তিনি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৩৪ ম্যাচ খেলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড গড়েন এবং তাঁর মোট বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১টিতে।
তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলা ইতিহাসের দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে নাম লেখান মেসি। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে হেরে যাওয়ায় তাঁর শেষটা কিছুটা বিষাদময় হয়। সেই ফাইনালের ছয় সপ্তাহ পর আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিলেন তিনি।
ক্যারিয়ারের শুরুতে সাফল্যের জন্য অপেক্ষমাণ সেই তরুণ মেসি আজ আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ফুটবলার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার আক্ষেপ থেকে শুরু করে বিশ্বজয়ের মুকুট পরা পর্যন্ত—মেসির এই ২০ বছরের নীল-সাদা অধ্যায় এখন শুধুই স্মৃতি। মাঠের বাঁ পায়ের জাদু আর গোলের পর সেই পরিচিত উদযাপন এখন থেকে কেবলই ইতিহাসের পাতায় থাকবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাঝপথে ছিল একের পর এক ফাইনালের হতাশা, এমনকি একবার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়ও বলেছিলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: দেশের হয়ে দুই শতাধিক ম্যাচ খেলা মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থামল ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোল নিয়ে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এই দীর্ঘ যাত্রার ৬টি বিশেষ মুহূর্ত আছে, যেগুলো মেসির ক্যারিয়ারকে সংজ্ঞায়িত করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: বদলি হিসেবে নামা তরুণ মেসির জন্য অভিষেকটা তাই হয়ে থাকে ভুল কারণে স্মরণীয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পরের বছরই অবশ্য বিশ্বকাপে দেখা যায় অন্য মেসিকে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সেদিন শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের সঙ্গে তাঁর এক কিংবদন্তিতুল্য সম্পর্ক। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০১৪ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপে মেসি তখন ২৬ বছরের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় সাফল্য তখনও অধরা।






