রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষার্থীদের অকাল প্রয়াণের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ১৬ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। এদের মধ্যে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের বাইরে মেস, ছাত্রাবাস কিংবা ভাড়া বাসায় থাকতেন। ধারাবাহিক এসব মৃত্যুর ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কাউন্সেলিং সেবা এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিস ও জনসংযোগ দপ্তরের তথ্য এবং বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, পরিবারের উচ্চ প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং একাকিত্ব শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।
ঘটনার ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ২৮ অক্টোবর ফলিত গণিত বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজ কবীরের মরদেহ ক্যাম্পাস-সংলগ্ন আমজাদের মোড় এলাকার একটি মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৯ ডিসেম্বর পটুয়াখালীতে নিজ বাড়িতে মারা যান নৃবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দেবজ্যোতি বসাক পার্থ। ২০২১ সালের ৩০ জানুয়ারি নগরীর মির্জাপুর এলাকার একটি আবাসিক ছাত্রী হোস্টেল থেকে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোবাসসিরা তাহসিন ইরার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে সময় পুলিশ জানিয়েছিল, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে। একই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েস নিজ বাড়িতে মারা যান।
২০২২ সালে একাধিক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ইশতিয়াক মাহমুদ পাঠান নিজ বাসায়, ৯ এপ্রিল প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সোহাগ খন্দকার নীলফামারীর সৈয়দপুরে নিজ বাড়িতে, ১৩ মে ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাবাসসুম নিজ ঘরে এবং ৬ জুন নাট্যকলা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া দিশা মারা যান। একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর বিয়ের তিন মাসের মাথায় অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছন্দা রায় মারা যান।
পরবর্তী বছরগুলোতেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাইমা আরাবী ইভা। ৮ জুন লোক-প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী তানভীর ইসলাম রিতুর মরদেহ বিনোদপুর এলাকার মেস থেকে এবং ১০ সেপ্টেম্বর শহীদ শামসুজ্জোহা হলের কক্ষ থেকে সমাজকর্ম বিভাগের ফুয়াদ আল খতিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফিশারিজ বিভাগের সিফাতুল্লাহর মরদেহ মেহেরচণ্ডী এলাকার ছাত্রাবাস থেকে, ১২ নভেম্বর শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সোনিয়া সুলতানার মরদেহ মির্জাপুরের আবাসিক ভবন থেকে এবং ৩১ ডিসেম্বর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের লামিসা নওরীন পুষ্পিতার মরদেহ বিনোদপুরের মেস থেকে উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারি সমাজকর্ম বিভাগের জুবাইদা ইসলাম ইতি এবং সবশেষ ১০ জুন ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের মাহফুজুর রহমানের মরদেহ ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব ঘটনার বড় একটি অংশ ঘটেছে মেহেরচণ্ডী, মির্জাপুর, বিনোদপুর ও আমজাদের মোড় এলাকার মেস ও ছাত্রাবাসে। হলের বাইরে অবস্থান করায় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন আচরণ বা মানসিক পরিবর্তনের বিষয়টি অনেক সময় প্রশাসন বা সহপাঠীদের নজরের বাইরে থেকে যায়, ফলে দ্রুত সহায়তা প্রদানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
রাবি মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধান চিকিৎসক অধ্যাপক মুর্শিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব জানান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন প্রবণতার পেছনে সামাজিক, মানসিক ও আর্থিক কারণ জড়িত। তিনি বলেন, এই বয়সটি নিজেকে গড়ে তোলার সময়। তাই পরিবার, শিক্ষক ও বন্ধুদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা জরুরি। দীর্ঘ সময় হতাশা অনুভব করলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, মেসে থাকা বা আবাসিক হলে থাকার সঙ্গে এসব ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে তিনি মনে করেন না। তবে মেসে শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে একা থাকায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের সুস্থ মানসিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়ানো প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন সেলের মাধ্যমে কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে এবং প্রক্টর অফিস বিষয়গুলো নিয়মিত তদারকি করছে।
শিক্ষার্থীরা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রতিটি বিভাগ ও আবাসিক হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো এবং হলের বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সংকটকালীন সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নয়, বরং মানসিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের আগেভাগেই শনাক্ত করে পেশাদার কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা এবং মেস ও ছাত্রাবাসগুলোতে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানো জরুরি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি চিকিৎসা মনোবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাইমা আরাবী ইভা অতিরিক্ত ওষুধ সেবনের পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ১০ সেপ্টেম্বর শহীদ শামসুজ্জোহা হলের কক্ষ থেকে সমাজকর্ম বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ফুয়াদ আল খতিবের লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফিশারিজ বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সিফাতুল্লাহর লাশ ক্যাম্পাস-সংলগ্ন মেহেরচণ্ডী এলাকার একটি ছাত্রাবাস থেকে উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নগরীর বিনোদপুরের লেবুবাগান এলাকায় মেস থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী লামিসা নওরীন পুষ্পিতার লাশ উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: প্রেম বা সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন, পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, একাকিত্ব ও হতাশা থেকে অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা তৈরি হতে পারে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের আত্মহত্যার ঘটনা দেখেও কেউ কেউ প্রভাবিত হতে পারেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মানসিকভাবে পাশে থাকার মতো মানুষ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা আত্মহত্যার প্রবণতা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।






