হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস ও এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা নেপালের জন্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। এর আগে ২০১২ সালে অন্নপূর্ণা-৪ রেঞ্জ থেকে বরফ ও পাথরের ধসে প্রাকৃতিক হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। একইভাবে ২০২৩ সালে ভারতের সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদ বিস্ফোরিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ঘটে যাওয়া বন্যা ও ভূমিধস ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতার হিমবাহের একটি অংশ ভেঙে পড়েছিল। বরফের এই বিশাল খণ্ড প্রায় ৪ হাজার ফুট নিচে আছড়ে পড়ে পাহাড়ের ঢাল ক্ষয় করে নিচে নেমে আসে, যা নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। চীনা ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ধ্বংসাবশেষের এই স্রোত ঘণ্টায় প্রায় ১৮০ কিলোমিটার গতিতে নিচে নেমে এসেছিল, যা মুহূর্তের মধ্যে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও জনপদ ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
হিমালয় রেঞ্জে হিমবাহ ধসের কারণে সৃষ্ট এই বন্যা কেবল নেপাল নয়, ভাটিতে থাকা ভারত ও বাংলাদেশের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি রোধে নেপাল সরকার ভোতেকোশি ও গণ্ডকী অববাহিকার উজানে থাকা চারটি হিমবাহ হ্রদের পানির স্তর কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২০ সালে ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিআইএমওডি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) যৌথ গবেষণায় সোলুখুম্বুর লুমডিং সো, হোঙ্গু-২, সংকুয়াসভার লোয়ার বারুন ও মানাংয়ের থুলাগি হ্রদগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। নেপালে বর্তমানে ২ হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ৪৭টি হ্রদ থেকে হঠাৎ পানি নির্গত হয়ে নেপাল, তিব্বত ও ভারতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে ২১টি হ্রদ নেপালের সীমানার ভেতরেই অবস্থিত।
বন্যা ঝুঁকি কমাতে নেপাল সরকার ও ইউএনডিপি যৌথভাবে ‘গ্লফ বা জিএলওএফ সঞ্জীবনী প্রকল্প’ নামে ৫ কোটি ডলারের একটি উদ্যোগ নিয়েছে। জাতিসংঘের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) থেকে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৬০ হাজার ডলার অনুদান পাওয়া গেছে এবং বাকি ১ কোটি ৩৮ লাখ ডলার নেপাল সরকার ও অংশীদাররা সংগ্রহ করবে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পাহাড়ি এলাকার প্রায় ২৩ লাখ মানুষ উপকৃত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক রাজন ভট্টরাই জানিয়েছেন, চলতি বছর পরামর্শক নিয়োগ ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মতো প্রস্তুতিমূলক কাজ চলবে। হ্রদগুলোর পানির স্তর কতটা কমানো হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত নয়, তবে অতীতে থো রোলপা ও ইমজা হ্রদে যে পরিমাণ (প্রায় ৩ মিটার) পানি কমানো হয়েছিল, এবারও তেমনটাই লক্ষ্যমাত্রা রাখা হতে পারে।
তবে এই তিন মিটারের মানদণ্ড নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র আপত্তি রয়েছে। মার্কিন পর্বত পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ অ্যালটন সি. বায়ার্স মনে করেন, থো রোলপা হ্রদের অভিজ্ঞতা থেকে এই মানদণ্ড নেওয়া হয়েছে, যা মোটেও যথেষ্ট নয়। তার মতে, থো রোলপার মূল পরিকল্পনায় ২০ মিটার পানি কমানোর কথা থাকলেও বাজেটের অভাবে তা তিন মিটারে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। বায়ার্স সতর্ক করে বলেন, বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী পানি কমালে ভাটির জনবসতিগুলো নিরাপদ হবে না এবং এটি অর্থের অপচয় হতে পারে। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিতেশ খাডকাও একই মত দিয়ে বলেন, কোটি কোটি ডলার খরচ করে মাত্র দুই বা চার মিটার পানি কমালে নিচের দিকে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে না। তার মতে, অন্তত ৭০ শতাংশ ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত পানি অপসারণ করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি হ্রদের জন্য আলাদা গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে মূল্যায়নের ওপর জোর দিয়েছেন। মার্কিন হিমবাহ বিশেষজ্ঞ জেফরি এস. কারগেল পরামর্শ দিয়েছেন, পানির স্তর কমানোর পাশাপাশি হ্রদ থেকে পানি বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তিনি আরও বলেন, হিমবাহ থেকে বন্যার সম্ভাব্য পথে অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। হিমবাহ ও হ্রদ বিশেষজ্ঞ রিজন ভক্ত কায়াস্থের মতে, শুধু বড় হ্রদগুলোই বিপজ্জনক নয়, নেপালের শত শত ছোট হ্রদ ও হিমবাহগুলোও সমানভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। তাই তালিকাভুক্ত হ্রদের বাইরেও অন্যান্য ছোট হ্রদগুলোর ওপর নজর দেওয়া এবং নিয়মিত স্যাটেলাইট ও রিমোট সেন্সিং তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঝুঁকি মোকাবিলা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, নেপালে বর্তমানে মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। এছাড়া সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে ৫ তলা ভবন ধসে ৩ জনের মৃত্যু ও ৯ জনকে জীবিত উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। নেপালের অন্যান্য সংকটের মধ্যে বিদুরের ১৫টি পানির উৎসের মধ্যে ৫টিতে ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। এছাড়া সম্প্রতি গভীর সুড়ঙ্গ থেকে নেপালি শ্রমিকদের উদ্ধারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছে, যেখানে উদ্ধার হওয়ার পর শ্রমিকরা জানিয়েছেন, অন্যদের বাঁচাতে গিয়েই তারা বের হতে পারেননি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকারে ‘দুর্বল’ আইন হচ্ছে জানিয়ে বিরোধীদলের ওয়াকআউট। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: র্যাব বিলুপ্তির নামে জবাবদিহিহীন প্রতিষ্ঠানের খোলস বদলে বিভ্রান্ত করা যাবে না: টিআইবি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: How did a mudslide hit Gyirong Port on the China-Nepal border in southwest China’s Xizang Autonomous Region। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: China Xinhua News (@XHNews) August 29, 2026। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এসব ধারাবাহিক দুর্যোগ একটি কঠিন প্রশ্ন সামনে এনেছে—আগামীতে কীভাবে এ ধরনের ধস ও বন্যা ঝুঁকি কমানো যায়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একইসঙ্গে এই উদ্যোগ প্রকৃতপক্ষে কতটা কাজে আসবে তাও বিশেষজ্ঞের বরাতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: ২০০০ সালে দোলখার থো রোলপা হ্রদের পানি তিন মিটার এবং ২০১৬ সালে সোলুখুম্বুর খুম্বু অঞ্চলের ইমজা হ্রদের পানি প্রায় ৩ দশমিক ৪ মিটার কমানো হয়।






