ভারতীয় বাংলা সিনেমার জীবন্ত কিংবদন্তি অভিনেত্রী সাবিত্রী চ্যাটার্জি ১৯৫১ সালে উত্তম কুমার অভিনীত ‘সহযাত্রী’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন। তবে ১৯৫২ সালে সুধীর মুখার্জি পরিচালিত প্রণয়ধর্মী হাস্যরসাত্মক সিনেমা ‘পাশের বাড়ি’তে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমেই তিনি প্রথম দর্শকদের নজর কাড়েন। সিনেমাটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সাফল্য পায়। এরপর ১৯৫৪ সালে আশাপূর্ণা দেবীর গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘অগ্নিপরীক্ষা’ সিনেমায় উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের জুটি রুপালি পর্দায় রোমান্সের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে। এই সিনেমাটি সুপারহিট হওয়ার পর ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তম কুমারের অবস্থান পাকাপাকিভাবে স্থায়ী হয়ে যায়। তবে সুচিত্রা সেন ছাড়াও সাবিত্রী চ্যাটার্জি, সুপ্রিয়া চৌধুরী, শর্মিলা ঠাকুর ও মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় নায়িকাদের বিপরীতে অভিনয় করে তিনি অসংখ্য ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছেন।
উত্তম কুমারের সঙ্গে সাবিত্রীর বন্ধুত্বের সূচনা হয় ১৯৫১ সালে। রুপালি পর্দার রোমান্স পেরিয়ে সেই সম্পর্ক ব্যক্তিগত জীবনের গভীরতাকে স্পর্শ করেছিল। সেই সময়ে উত্তম-সাবিত্রীর প্রেমের গুঞ্জন ইন্ডাস্ট্রিতে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এমনকি সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল যে তারা বিয়ে করেছেন। সেই খবর ঘিরে চারদিকে নানা জলঘোলা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল। সাবিত্রী স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিয়ের খবর প্রকাশের দিনটি তার আজও মনে পড়ে। তিনি বলেন, “ওই খবরের কাগজটা আর সকলের মতো সে দিন আমিও কিনে এনেছিলাম। পড়ার পরে স্তম্ভিত হয়ে খানিকক্ষণ বসেছিলাম। তারপরে খালি মনে হতো এই খবরের কাগজের লেখাগুলো যদি সত্যি হতো, কী ভালোই না হতো।”
উত্তম কুমারকে ভালোবাসার কথা কখনোই অস্বীকার করেননি সাবিত্রী। তবে উত্তম কুমার তাকে বলতেন, “তুই তো আমার ছেলের থেকে কয়েক বছরের বড়। আমার হাঁটুর চেয়েও কম বয়স তোর।” সাবিত্রী মনে করেন, “যে ভালোবাসা যত গোপন, সেই ভালোবাসা তত গভীর”—হুমায়ূন আহমেদের এই উক্তিটি যেন তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সত্য ছিল। যদিও উত্তম কুমার শেষ পর্যন্ত সংসারী মানুষ হিসেবেই জীবন অতিবাহিত করেছেন, কিন্তু সাবিত্রীর জীবনের গল্প অন্য সুরের। ৮৯ বছরের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজও তিনি একা। তার জীবনে ভালোবাসা এসেছিল, মানুষও এসেছিল, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত ঘর বাঁধার ঠিকানা হয়ে ওঠেনি। উত্তম কুমার তার কাছে শুধু একজন সহশিল্পী নন, বরং এক অসমাপ্ত অধ্যায়।
সাবিত্রীর আত্মজীবনী ‘সত্যি সাবিত্রী’ বইয়ে তিনি লিখেছেন, হাজার মানুষের ভিড়েও তিনি নিজেকে শূন্য অনুভব করতেন। সেই একাকিত্ব থেকেই তিনি মদ্যপানের অভ্যাস গড়ে তোলেন। তিনি বলেন, “আমি চিরকাল মদ খেয়েছি, কিন্তু মদ আমাকে খেতে পারেনি। যদি আজও মনের মতো কোনো সঙ্গী পাই, বন্ধু পাই, তবে আমার মদের প্রয়োজন পড়ে না।” উত্তম কুমারই প্রথম সাবিত্রীকে পরিমিত পরিমাণে মদ্যপান করা শিখিয়েছিলেন। তবে সাবিত্রীর বাবা শশধর চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার এই অভ্যাস কিছুটা বেড়ে যায়।
পেশাগত সীমানা ছাড়িয়ে উত্তম কুমারের সঙ্গে সাবিত্রীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল বেশ ঘনিষ্ঠ। উত্তম কুমার প্রায়ই সাবিত্রীর বাড়িতে গিয়ে খাবার খেতেন। সাবিত্রীর বড় বোন খুব ভালো রান্না করতেন। উত্তম কুমার তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, যদি কখনো সিনেমা থেকে সরে যেতে হয়, তবে যেন তিনি একটি রেস্তোরাঁ খোলেন। সাবিত্রী আজও সেই স্মৃতিগুলো পরম যত্নে আগলে রেখেছেন। উত্তম কুমার তাকে সংক্ষেপে ‘সাবু’ বলে ডাকতেন। সেই ডাকের স্মৃতি মনে পড়লে আজও তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, “সাবু’ বলে অমন ডাক কত বছর হয়ে গেল শুনি না। এখনো কিছু কথা মনে পড়লে চোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ে।”
উত্তম-সাবিত্রী জুটি ‘লাখ টাকা’, ‘কল্যাণী’, ‘অনুপমা’, ‘রাইকমল’, ‘নবজন্ম’, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’, ‘রাজা সাজা’, ‘দুই ভাই’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, ‘মোমের আলো’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘রাতভোর’, ‘উপহার’, ‘মৌচাক’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘নূপুর’ এবং ‘গলি থেকে রাজপথ’-এর মতো অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সাবিত্রী মনে করেন, এমন জুটি আর কখনো তৈরি হবে না। তিনি আরও বলেন, “উত্তমকুমার বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে ‘মহানায়ক’ হয়েছেন। একটা সময়ে এমপি প্রোডাকশনের সঙ্গে বহু সিনেমা করেছিলেন। ‘বসু পরিবার’ সিনেমায় সুপ্রিয়াদেবী ও আমি ছিলাম। সিনেমাটি সুপারহিট হয়েছিল। তার আগে উত্তমকুমার অনেক সিনেমা করলেও, একটাও সেভাবে হিট হয়নি। কিন্তু ওই সিনেমায় এমন একটা ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, যা অভাবনীয়।”
উত্তম কুমারকে নিয়ে সাবিত্রী বলেন, “উত্তম কুমার খুব ভালো মানুষ ছিলেন। তার গুণ সম্পর্কে আপামর জনগণ জানেন। আমি তার থেকে সাহায্য পাইনি; তার কাছ থেকে আমি কিছুই পাইনি। তার সঙ্গে অভিনয় করতে আমার ভালো লাগত, এটুকুই।” সাবিত্রীর মতে, মানুষের শরীরের মৃত্যু হয়, কিন্তু আত্মার মৃত্যু হয় না। হয়তো সে কারণেই এত বছর পরও উত্তম কুমারকে ঘিরে এত আলোচনা। বছরের ৩৬৫ দিনের কোনো না কোনো প্রহরে তার কোনো সিনেমা, কোনো চরিত্র, কোনো সংলাপ কিংবা নিছক কোনো স্মৃতিতে তিনি ফিরে আসেন। সাবিত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন, উত্তম কুমার তার প্রতি পজেসিভ ছিলেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, উত্তম কুমারের মৃত্যুর খবর কোনো না কোনোভাবে আড়ালে থাকলেও তা সামনে চলেই আসে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: রুপালি পর্দায় এ জুটির রোমান্স দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যে অধ্যায়ের শেষটুকু লেখা হয়নি কখনো, অথচ সময় পেরিয়ে গেলেও যার স্মৃতি মুছে যায়নি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: উত্তমকে নিয়ে যতবারই কথা বলেছে ন সাবিত্রী, তার কথার ফাঁকে ফাঁকে যেন সেই ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর না-ভোলা স্মৃতিটুকুই ফিরে এসেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একেবারে জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া যাকে বলে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: যতদিন বাঁচবেন, ততদিন একঝাঁক স্মৃতি বয়ে বেড়াবেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অনেকেই বলে থাকেন—উত্তমের প্রতি তার ভালোবাসাকে সম্মান দিতেই সাবিত্রী সারাজীবন সঙ্গীহীন থেকে গেলেন। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: পর্দায় তাদের রসায়ন দর্শকরা উপভোগ করেছেন, নতুন মিডিয়ায় তাদের যেসব সিনেমা সংরক্ষিত রয়েছে, সেসব এখনো উপভোগ করছেন সিনেমাপ্রেমীরা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কেউ বিশ্বাস করুক বা না-ই করুক, সত্যি এটাই।






