যমুনা নদীর ওপর নির্মাণাধীন রেল সেতু প্রকল্প নিয়ে বিশেষ নিরীক্ষায় প্রায় ১০ হাজার ৪৭৯ কোটি ১৯ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়ম ও ক্ষতির তথ্য উদঘাটিত হয়েছে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) কার্যালয়ের অধীনে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও ব্যয় যাচাই করে মোট ৫৪টি ফাইন্ডিংস চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি আর্থিক বিবরণী সংক্রান্ত, ৪৬টি নিয়মানুগতা বা কমপ্লায়েন্স অডিট এবং চারটি পারফরম্যান্স অডিটের বিষয় রয়েছে। এতে আর্থিক বিবরণী, বিধিবিধান মেনে চলা এবং প্রকল্পের কর্মদক্ষতা—এই তিনটি দিক পর্যালোচনা করা হয়। যমুনা সেতুর প্রায় ৩০০ মিটার উজানে সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ ডাবল ট্র্যাকের রেল সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল রেলওয়ে ভায়াডাক্ট, রেলপথ, ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম স্টেশনের আধুনিকায়ন এবং কম্পিউটারভিত্তিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা।
প্রকল্পের শুরুতে ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হলেও পরবর্তীতে তা ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা প্রাথমিক প্রাক্কলনের চেয়ে প্রায় ৭২ শতাংশ বেশি। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। নিরীক্ষায় উঠে এসেছে যে, সেতুর স্টিল গার্ডার ট্রাস জাপান বা ভিয়েতনাম থেকে আসার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মাইনমার থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। এই নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের কারণে সরকারের প্রায় ১১৪ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে এবং শুল্ক-ভ্যাট বাবদ আরও ৫ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা, যার বড় অংশ ছিল জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) ঋণ। একই সঙ্গে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে বড় আর্থিক ক্ষতি শনাক্ত হয়েছে স্টিল পাইপ শিট পাইল (এসপিএসপি) প্রযুক্তির ব্যবহারকে কেন্দ্র করে। অডিট রিপোর্টে দেখা গেছে, সেতু নির্মাণে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করায় সরকারের প্রায় ৭ হাজার ৪৭ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া নির্ধারিত পরিমাণের অতিরিক্ত এসপিএসপি ব্যবহারের জালিয়াতি করে আরও প্রায় ১০৬ কোটি টাকার শুল্ক ও ভ্যাট আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন বলছে, সেতু নির্মাণে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এই প্রযুক্তি যুক্ত করায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৭,০৪৭ কোটি টাকা।
দরপত্র প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়মের কারণে সরকারের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দরপত্রের শর্ত ভঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও তা বাতিল না করে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে কাজের পরিমাণ কমিয়ে ইউনিট রেট বাড়িয়ে চুক্তি সই করা হয়েছে। রেলপথের পাথর বা ব্যালাস্ট সরবরাহেও অনিয়ম হয়েছে; চুক্তি অনুযায়ী ৬০ মিলিমিটারের পরিবর্তে ৯০ মিলিমিটার আকারের ব্যালাস্ট ব্যবহার করা হয়েছে, যা থেকে প্রায় সাড়ে ৪৫ কোটি টাকা ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) গাড়ির কোনো সংস্থান না থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদারের মাধ্যমে ৩০টি গাড়ি কেনা হয়েছে, এতে প্রায় ২৮ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া নকশা অনুসরণ না করে কাজ করায় ৬৩ কোটি টাকা এবং যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই নকশা পরিবর্তনের বিল পরিশোধ করায় ৪৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। মূল চুক্তিতে না থাকা ড্রেজিং ও মাটি ভরাটের কাজ দেখিয়ে আরও সাড়ে ৮৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরামর্শক সেবা খাতের অনিয়ম নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাব-কনসালট্যান্ট নিয়োগের মাধ্যমে সার্ভে ও ডিজাইনের কাজ করিয়ে ৪ কোটি টাকা গচ্ছা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পরামর্শক ফি বাবদ সাড়ে ৮ কোটি টাকা এবং ত্রুটিপূর্ণ নকশার জন্য ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে পৌনে ২ কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি আয়কর ও ভ্যাট সঠিকভাবে কর্তন না করায় সরকারের প্রায় ৮২ কোটি টাকা এবং ৭৩ কোটি টাকা করে বড় অঙ্কের আর্থিক লোকসান হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে সেতুটির মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। ট্রেন চলাচলের সময় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কম্পন দেখা দিচ্ছে, যা সেতুর দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। প্যাকেজ ব্যবস্থাপনায় ‘ডব্লিউডি-১’ প্যাকেজের কাজ ‘ডব্লিউডি-২’ প্যাকেজের মাধ্যমে ভেরিয়েশন দেখিয়ে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে আরও সাড়ে ৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান জানিয়েছেন, তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন এবং অডিট প্রতিবেদনের প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখ্যা দেবেন। অন্যদিকে, রেলওয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা আনিসুর রহমানকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রকল্পে শুধু আর্থিক হিসাবই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত ছিল। অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগগুলো নকশা, পরীক্ষার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে নিষ্পত্তি করার সুপারিশ করা হয়েছে।






