দেশে দিন দিন নারীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গাঁজা, ইয়াবা ও ই-সিগারেটের পাশাপাশি অনেক তরুণী এখন মদ্যপানের দিকেও ঝুঁকছেন। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু বা স্বামীর প্ররোচনা, পারিবারিক অশান্তি, হতাশা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবের কারণে নারীদের একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, গৃহিণী ও বিভিন্ন পেশার নারীরাও এখন মাদকাসক্তির শিকার হচ্ছেন। সামাজিক সংকোচ ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগের কারণে তাদের বড় একটি অংশ যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আসতে পারছেন না।
নারকোটিক্সের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ বছরে শুধু সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১০৬ জন নারী মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সাধারণত ছিন্নমূল ও হতদরিদ্র নারীরা সরকারি কেন্দ্রে ভর্তি হলেও উচ্চ ও মধ্যবিত্ত নারীদের বড় একটি অংশ বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসা নেন। বেসরকারি সংস্থা আহ্ছানিয়া মিশন রাজধানীর শ্যামলীতে ৪০ শয্যাবিশিষ্ট একটি নারী মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনা করে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩১ জন। এদের মধ্যে ২০ জনই ইয়াবা আসক্ত। চিকিৎসাধীনদের ১২ জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, চারজন গৃহিণী, দুজন ব্যবসায়ী, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১১ জন বেকার।
সম্প্রতি সেখানে গেলে চিকিৎসাধীন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী কাছে তার মাদকে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম নেওয়া এই তরুণীর বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়। তবে ৩ গুণ বেশি বয়সি স্বামীর সঙ্গে তিনি সেভাবে মানিয়ে উঠতে পারেননি। জীবনের প্রতি হতাশা থেকে তিনি ধীরে ধীরে মাদকের দিকে হাত বাড়ান। তিনি জানান, ইয়াবা সেবনের ভয়াবহতা স্কুল পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এবং পাড়া-মহল্লায় অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে।
মাদকাসক্তির চিকিৎসায় আহ্ছানিয়া মিশনের নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এক নারী চিকিৎসক। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘ সময় আইসিউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এ সময় টানা কয়েক মাস তাকে ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়, যা থেকে তিনি পরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ঘটনাক্রমে মাদকের প্রতি তার আসক্তি তৈরি হলেও বাস্তবে চিকিৎসকদের কেউ কেউ অনেক সময় প্রচণ্ড পেশাগত চাপের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কেউবা পদোন্নতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ে কিংবা হতাশা থেকেও মাদক নিয়ে থাকেন।
ইয়াবা ছাড়াও তরুণীদের মধ্যে মদ্যপানের প্রবণতা বাড়ছে। চলতি বছর মদ পানের পারমিট পেতে হাজারেরও বেশি তরুণী নারকোটিক্সে আবেদন করেছেন। এদের মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ শতাধিক তরুণীর নামে পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। নারকোটিক্সের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁও এলাকায় মদ পানকারী নারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। চলতি বছর এ তিন এলাকার মধ্যে গুলশানে ২৮৮, উত্তরায় ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদ পানের পারমিট নিয়েছেন।
প্রচলিত আইন অনুযায়ী মুসলিমদের মদ পানের লাইসেন্স প্রাপ্তির সুযোগ না থাকলেও আইনের ফাঁক ও অসাধু কর্মকর্তাদের সহায়তায় অনেকে পারমিট নিচ্ছেন। এমনকি ভুয়া চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করেও প্রচুর পরিমাণে পারমিট ইস্যু করা হচ্ছে। নারকোটিক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, নারীদের মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়া সমাজের জন্য উদ্বেগের। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু কিংবা স্বামীর দ্বারা প্ররোচিত হন। এছাড়া পরিবারের বড়দের মাদক গ্রহণের অভ্যাসও অন্যদের প্রভাবিত করে।
আহ্ছানিয়া মিশনের নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের পরামর্শক আঞ্জুমান আরা বলেন, সম্প্রতি শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যেও মাদক সেবনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৭ বছরের কিশোরী থেকে ৪৮ বছর বয়সি নারীরাও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছেন। ইয়াবা সেবন নিয়ে নারীদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে এটি ওজন কমায়, অথচ দীর্ঘমেয়াদে এটি বন্ধ্যত্বসহ বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা তৈরি করে।






