ভোরে ঘুম থেকে উঠে পড়াশোনা আর দিনের বাকি সময় মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি—এভাবেই চলছিল ১৮ বছর বয়সী আরাফাত হোসেনের জীবন। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বাগমারা পশ্চিমপাড়ার এই তরুণের জীবনের গল্পটা সংগ্রামের। ২০২১ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা আবুল কাশেম মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব চাপে কিশোর আরাফাতের কাঁধে। সংসারের চাকা সচল রাখতে একাধারে তিনি পানবরজে শ্রমিকের কাজ, ধান কাটা ও মাটি কাটার মতো কঠিন পরিশ্রমের কাজ করেছেন। দিনমজুরের কাজ সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরা—এভাবেই চলছিল ১৮ বছরের তরুণ আরাফাত হোসেনের জীবন। ভোরে ঘুম থেকে জেগে পড়াশোনা, পরে একটু বেলা হলেই জীবনের তাগিদে মাঠে ছুটে যাওয়া। বাবার মৃত্যুর পর চার বছরের ছোট ভাই ও মায়ের দায়িত্ব এসে পড়ে কিশোর আরাফাতের কাঁধে। এসএসসি পাসের পর সংসারের চাপ আরও বাড়ায় পুরোদমে দিনমজুরের কাজে নামতে হয় আরাফাতকে। গতকাল রোববার দুপুরে আরাফাতের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি তখন তাঁর চাচার পানবরজে কাজ করছিলেন।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল ছিলেন আরাফাত। বাবার রেখে যাওয়া পুরোনো সাইকেল চালিয়ে ছয় কিলোমিটার দূরে ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে যাতায়াত করতেন তিনি। সপ্তাহে তিন দিন কলেজে ক্লাস করলেও বাকি দিনগুলোতে বেছে নিতেন দিনমজুরের কাজ। আর্থিক অভাবের কারণে সব গাইড বা সহায়ক বই কিনতে পারেননি। এমনকি দুই বছর ধরে তিনি মাত্র এক জোড়া পোশাকেই পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার ও শনিবার ছাড়াও সপ্তাহের যেসব দিনে গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকত না, সেই দিনগুলোতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতেন।
এত কষ্ট সত্ত্বেও এবার মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। গত শনিবার পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর থেকে তাঁর এই সাফল্যে পরিবার ও এলাকাবাসী অত্যন্ত আনন্দিত। তাঁর এই যাত্রায় মা শিল্পী খাতুন পাশে দাঁড়িয়েছেন সাহস ও অনুপ্রেরণা জুগিয়ে। সংসারের খরচ মেটাতে মা স্থানীয় শিশুদের প্রাইভেট পড়াতেন। আরাফাত জানান, কঠোর পরিশ্রমের কারণে এসএসসিতে আশানুরূপ ফল না পেলেও তিনি ভেঙে পড়েননি, বরং উচ্চমাধ্যমিকের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছেন।
কলেজের শিক্ষকেরা তাঁকে বই ও নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে জানান আরাফাত। তাঁর মা শিল্পী খাতুন ছেলের সাফল্যে গর্বিত হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। তিনি বলেন, ছেলের পড়াশোনার পেছনে নিয়মিত খাবার বা ভালো পোশাকের জোগান দিতে পারেননি, এরপরও ছেলে অদম্য ছিল। এখন সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে শহরে পাঠিয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও তা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে তাঁর মনে।
আরাফাতের প্রতিবেশী ও ভবানীগঞ্জ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শিক্ষক মামুনুর রশিদ বলেন, শত বাধা ও অভাব-অনটনের মাঝেও অদম্য অধ্যবসায়ের জোরে আরাফাত যা অর্জন করেছে, তা সত্যিই অনুকরণীয়। তার এই সাফল্যে পুরো কলেজ পরিবার গর্বিত। তবে তার উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।






